“মন্তব্য প্রতিবেদন”

আইন কি সত্যিই অন্ধ? ন্যায়বিচারের নামে নিরপরাধের ভোগান্তির দায় নেবে কে?

মমিনুল ইসলাম মুন

আইন সবার জন্য সমান—এটি একটি সভ্য, গণতান্ত্রিক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক ভিত্তি। রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অপরাধ দমন করবে, প্রকৃত অপরাধীকে আইনের আওতায় আনবে এবং নিরপরাধ মানুষকে সুরক্ষা দেবে—এটাই সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা।

কিন্তু বাস্তবতার কিছু ঘটনা মাঝে মাঝে আমাদের সামনে এমন কিছু প্রশ্ন দাঁড় করিয়ে দেয়, যার উত্তর খুঁজে পাওয়া কঠিন।

প্রশ্ন হলো—কোনো একজন মানুষের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠলেই কি তার বিরুদ্ধে মামলা রেকর্ড ও গ্রেপ্তারই একমাত্র পথ? অভিযোগের সত্যতা যাচাই, প্রাথমিক অনুসন্ধান এবং নিরপেক্ষ তদন্তের কি কোনো প্রয়োজন নেই?

একজন মানুষ যদি কোনো মামলায় গ্রেপ্তার হন, হাজত বা কারাগারে দিন কাটান, সামাজিকভাবে হেয় হন, ব্যবসা-বাণিজ্য বা কর্মজীবনে ক্ষতির মুখে পড়েন, পরিবার-পরিজন মানসিক যন্ত্রণায় থাকেন—আর পরবর্তীতে আদালতের বিচারে তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হন, তাহলে তার হারিয়ে যাওয়া সময় কে ফিরিয়ে দেবে?

কারাগারের চার দেয়ালের মধ্যে কাটানো দিনগুলো কি সরকার ফিরিয়ে দিতে পারবে?

গ্রেপ্তারের কারণে হারানো কর্মসংস্থান, ব্যবসার ক্ষতি, সামাজিক সম্মান, পারিবারিক শান্তি কিংবা মানসিক যন্ত্রণা—এসবের ক্ষতিপূরণ কি সবসময় অর্থ দিয়ে পূরণ করা সম্ভব?

সময় চলে গেলে সময় আর ফিরে আসে না। সম্মান নষ্ট হলে তা ফিরিয়ে আনাও সহজ নয়।

বিশেষ করে ধর্ষণের অভিযোগ—দুই পক্ষের ন্যায়বিচারই জরুরি

ধর্ষণ একটি অত্যন্ত গুরুতর ও স্পর্শকাতর অভিযোগ। কোনো নারী এমন অভিযোগ করলে সেটিকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। একজন প্রকৃত ভুক্তভোগীর অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করা, তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

কিন্তু একই সঙ্গে আরেকটি বিষয়ও ভুলে গেলে চলবে না—শুধু অভিযোগ উঠেছে বলেই একজন মানুষ অপরাধী হয়ে যান না।

অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের দায়িত্ব তদন্ত ও আদালতের। আর এই জায়গাতেই প্রয়োজন সর্বোচ্চ সতর্কতা, নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্ব।

কারণ একটি মিথ্যা বা ভিত্তিহীন অভিযোগ যেমন একজন প্রকৃত ভুক্তভোগীকে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করতে পারে, তেমনি একজন নিরপরাধ ব্যক্তির জীবনও বিপর্যস্ত করে দিতে পারে।

তাই আমার সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ থেকে মনে করি, ধর্ষণসহ অত্যন্ত স্পর্শকাতর মামলার ক্ষেত্রে আইনসম্মত প্রক্রিয়ার মধ্যেই প্রাথমিক অনুসন্ধান ও তদন্তকে আরও কার্যকর করা প্রয়োজন।

তানোরের পাচন্দর ইউপির দেউলা ডাঙ্গাপাড়ার ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন

সম্প্রতি তানোর উপজেলার পাচন্দর ইউনিয়নের দেউলা ডাঙ্গাপাড়া গ্রামের একটি মামলা নিয়ে স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনা ও একাধিক সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ ঘটনা নিয়ে ভিডিও ও বিভিন্ন বক্তব্য ছড়িয়ে পড়েছে।

মামলার আসামি মিলনকে ঘিরে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ ও বক্তব্য সামনে এসেছে। স্থানীয় পর্যায়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে এমন কিছু বক্তব্যও পাওয়া গেছে, যেখানে দাবি করা হচ্ছে—মামলাটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে করা হয়েছে এবং আসামিকে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

এমনকি তাকে মীমাংসার জন্য চাপ দেওয়া, অর্থের প্রস্তাব দেওয়া এবং পরে তিনি তাতে রাজি না হওয়ায় মামলা রেকর্ড করা হয়েছে—এমন অভিযোগও স্থানীয়ভাবে উঠেছে।

তবে এসব অভিযোগের সত্যতা চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা তদন্তকারী সংস্থা ও আদালতের বিষয়।

কিন্তু এখানেই একজন সাংবাদিক হিসেবে কিছু প্রশ্ন করতেই হয়।

যদি অভিযোগটি সত্য হয়, তাহলে আইন অবশ্যই তার নিজস্ব গতিতে চলবে। প্রকৃত অপরাধী হলে তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক। কোনো অপরাধী যেন সাংবাদিকতার প্রশ্নে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চাপে কিংবা প্রভাবশালীদের কারণে ছাড় না পায়—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

কিন্তু যদি অভিযোগটি মিথ্যা হয়?

যদি আসামি মিলন সত্যিই ঘটনার সঙ্গে জড়িত না থাকেন?

যদি তদন্তে প্রমাণিত হয় যে তাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মামলায় জড়ানো হয়েছে?

তাহলে তার গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় পালিয়ে বেড়ানো, সামাজিকভাবে অপমানিত হওয়া, পরিবারকে মানসিক চাপে থাকা এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার দায় কে নেবে?

মামলা রেকর্ডের আগে কি আরও সতর্ক হওয়া উচিত ছিল না?

এখানে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে—অবশ্যই প্রশ্নটি কোনো ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করার জন্য নয়; বরং একটি দায়িত্বশীল ও জবাবদিহিমূলক আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার স্বার্থে।

যখন কোনো গুরুতর অভিযোগকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও প্রকাশিত হচ্ছে, সংবাদমাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে এবং একই ঘটনা নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য সামনে আসছে, তখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কি বিষয়টি আরও গুরুত্ব দিয়ে যাচাই করতে পারে না?

মামলা রেকর্ডের আগে আইনসম্মতভাবে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা যাচাইয়ের সুযোগ থাকলে তা কেন ব্যবহার করা হবে না?

আমি বলছি না—অভিযোগকারীকে অবিশ্বাস করতে হবে।

আমি বলছি না—নারীর অভিযোগকে গুরুত্ব দেওয়া যাবে না।

বরং আমি বলছি—অভিযোগকারী যেমন ন্যায়বিচারের অধিকার রাখেন, অভিযুক্ত ব্যক্তিও ন্যায়বিচারের অধিকার রাখেন।

এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্যই হলো আইনের সৌন্দর্য।

একটি মামলা শুধু একটি কাগজ নয়—একটি মানুষের জীবন

আমরা অনেক সময় ভুলে যাই, একটি মামলা শুধু থানার একটি এজাহার কিংবা আদালতের একটি নথি নয়। একটি মামলার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি মানুষের জীবন, তার পরিবার, তার সামাজিক অবস্থান, তার কর্মজীবন এবং ভবিষ্যৎ।

একজন ব্যক্তি গ্রেপ্তার হলে তার পরিবারকে সমাজের নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। সন্তানদের মানসিক অবস্থার ওপর প্রভাব পড়ে। ব্যবসা বা চাকরি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আত্মীয়-স্বজন দূরে সরে যেতে পারেন। সামাজিকভাবে একটি বদনাম তৈরি হতে পারে।

পরবর্তীতে আদালতে যদি তিনি খালাসও পান, তবুও কি আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারেন?

আদালতের রায় তার আইনি অবস্থান পরিষ্কার করতে পারে, কিন্তু হারিয়ে যাওয়া সময় ফিরিয়ে দিতে পারে না।

এই বাস্তবতাটিই আমাদের আরও সতর্ক হওয়ার শিক্ষা দেয়।

আইনকে কঠোর হতে হবে, কিন্তু অন্ধভাবে নয়

অপরাধীর বিরুদ্ধে আইন কঠোর হোক—এ দাবি আমিও করি।

কিন্তু আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কঠোরতার পাশাপাশি বিবেচনা, তদন্ত, প্রমাণ, নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহি থাকতে হবে।

কারণ আইন যদি প্রকৃত অপরাধীকে শাস্তি দেয়—এটি ন্যায়বিচার।

কিন্তু আইন যদি কোনো নিরপরাধ ব্যক্তিকে অযথা হয়রানির শিকার করে—তাহলে সেটিও সমাজের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়।

একজন নারী মিথ্যা অভিযোগ করবেন—এমন সাধারণীকরণ যেমন অনুচিত, তেমনি কোনো নারীর অভিযোগ উঠলেই অভিযুক্ত ব্যক্তিকে সামাজিকভাবে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করাও ন্যায়সংগত নয়।

অভিযোগ আর অপরাধ—দুটি এক বিষয় নয়।

অভিযোগ তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণিত হবে। প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার হবে। আর বিচারিক প্রক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে অপরাধী কে।

আমার প্রশ্ন—দায়িত্বশীলতার জায়গাটি কোথায়?

একজন মানুষ যদি মিথ্যা মামলায় আসামি হন, গ্রেপ্তার হন কিংবা গ্রেপ্তার এড়াতে দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকেন এবং পরবর্তীতে প্রমাণিত হয় তিনি নির্দোষ—তাহলে তার জীবনের সেই ক্ষতিপূরণ কে করবে?

তার হারানো সময় কে ফিরিয়ে দেবে?

তার পরিবারের আতঙ্ক কে দূর করবে?

তার সামাজিক সম্মান কে ফিরিয়ে দেবে?

তার আর্থিক ক্ষতি কে বহন করবে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আমাদের রাষ্ট্রীয় বিচার ও আইন প্রয়োগব্যবস্থার কাছ থেকেই প্রত্যাশা করি।

আর তাই শুধু মামলা গ্রহণ ও গ্রেপ্তার নয়—মামলার পেছনে থাকা সত্য উদঘাটনেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

সাংবাদিক হিসেবে আমার অবস্থান স্পষ্ট

আমি কোনো অভিযুক্তের পক্ষে নই।

আমি কোনো অভিযোগকারীর বিপক্ষেও নই।

আমি সত্যের পক্ষে।

আমি চাই, প্রকৃত ভুক্তভোগী ন্যায়বিচার পান। একই সঙ্গে কোনো নিরপরাধ মানুষ যেন মিথ্যা, ভিত্তিহীন বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগের কারণে তার জীবনের মূল্যবান সময় হারিয়ে না ফেলেন।

তানোরের পাচন্দর ইউনিয়নের দেউলা ডাঙ্গাপাড়ার ঘটনাটিও তদন্তের মাধ্যমে সত্য-মিথ্যা পরিষ্কার হোক—এটাই আমার প্রত্যাশা।

মিলন অপরাধী হলে আইন অনুযায়ী তার বিচার ও শাস্তি হোক। আর যদি তিনি অপরাধী না হন, তাহলে তাকে অযথা হয়রানি করা হয়ে থাকলে সেটিরও জবাবদিহি নিশ্চিত হোক।

কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে বলেই যেন তদন্তের আগেই তাকে অপরাধী বানিয়ে না ফেলা হয়।

সরকারের প্রতি বিনীত অনুরোধ,

ধর্ষণসহ সব ধরনের স্পর্শকাতর মামলার ক্ষেত্রে তদন্ত প্রক্রিয়াকে আরও আধুনিক, নিরপেক্ষ, দ্রুত ও জবাবদিহিমূলক করা প্রয়োজন।

অভিযোগকারীর অধিকার যেমন নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি অভিযুক্তের ন্যায্য অধিকারও রক্ষা করতে হবে।

মিথ্যা অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকতে হবে। একইভাবে প্রকৃত অপরাধ প্রমাণিত হলে কোনো প্রভাব, চাপ বা সামাজিক পরিচয়ের কারণে যেন অপরাধী ছাড় না পায়—সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

কারণ—

ন্যায়বিচার মানে শুধু অপরাধীকে শাস্তি দেওয়া নয়।

ন্যায়বিচার মানে নিরপরাধ মানুষকে সুরক্ষা দেওয়াও।

আর আইন যদি সত্যিই সবার জন্য সমান হয়, তাহলে সেই সমতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হতে হবে—অভিযোগের আগে নয়, সত্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত।

প্রশ্ন রইল—একজন নিরপরাধ মানুষের হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো কি কোনো আদালত ফিরিয়ে দিতে পারে?

উত্তর—না।

তাই বিচার হোক, তবে যাচাই করে।

মামলা হোক, তবে আইনি প্রক্রিয়া মেনে।

গ্রেপ্তার হোক, তবে যথাযথ ভিত্তিতে।

আর শাস্তি হোক—প্রমাণিত অপরাধের ভিত্তিতে।

কারণ একজন নিরপরাধ মানুষের জীবন ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর তাকে নির্দোষ প্রমাণ করাই ন্যায়বিচারের পূর্ণতা নয়; তাকে অযথা হয়রানি থেকে রক্ষা করাও ন্যায়বিচারের দায়িত্ব।

 

 লেখক পরিচিত :

  মমিনুল ইসলাম মুন,

 সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

 সম্পাদক ও প্রকাশক,

 দেশবার্তা বিডি ২৪.কম।

 স্টাফ রিপোর্টার, 

 দৈনিক গণধবনি প্রতিদিন,

 সময়ের কথা ২৪ 

 এবং আলোকিত ৭১ সংবাদ।

Email : mominulinqilab@gmail.com

📲 ০১৭৪০৯৩৫৮৭০ 

By চাঁদ২৪

মমিনুল ইসলাম মুন। সম্পাদক ও প্রকাশক। দেশবার্তা বিডি ২৪. কম। 📲 01740 93 58 70 বার্তাকক্ষ-01722 320196 Email : mominulinqilab@gmail.com deshbartabd86@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *