মোহনপুর সরকারি খাদ্য গুদামে ধান সংগ্রহে সিন্ডিকেটের অভিযোগ, বঞ্চিত প্রকৃত কৃষক

রাজশাহী প্রতিনিধি:

রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার সরকারি খাদ্য গুদামে চলতি বোরো মৌসুমে ধান সংগ্রহকে কেন্দ্র করে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রভাবশালী একটি চক্র গুদাম কর্মকর্তার যোগসাজশে কৃষকের নামে ধান সরবরাহ করছে। ফলে সরকারের নির্ধারিত মূল্যে ধান বিক্রির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন প্রকৃত কৃষকরা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এবারের অভ্যন্তরীণ বোরো সংগ্রহ অভিযানে অনেক প্রকৃত কৃষক অংশ নিতে পারেননি। তাদের কৃষক কার্ড ভাড়া নিয়ে, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে কৃষকের অজান্তেই ধান সরবরাহ করা হয়েছে। পাশাপাশি নীতিমালা লঙ্ঘন করে বন্ধ চালকলের (চাতাল) সঙ্গে চুক্তি করে চাল সংগ্রহ ও ছাঁটাইয়ের জন্য ধান বরাদ্দ দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।

ভুক্তভোগীদের দাবি, সরকারি খাদ্য গুদাম থেকে বাইরে সরকারি বস্তা সরবরাহের কোনো নিয়ম না থাকলেও আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে প্রভাবশালীদের কাছে সরকারি বস্তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। তাদের অভিযোগ, জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের (ডিসি ফুড) কার্যালয়ের কারিগরি পরিদর্শক শফিউর রহমান ও অডিটর মশিউর রহমানের নেপথ্য মদদে এসব অনিয়ম সংঘটিত হচ্ছে।

তাদের দাবি, সংশ্লিষ্ট চালকলগুলো সরেজমিন পরিদর্শন, বিদ্যুৎ বিল যাচাই এবং তালিকাভুক্ত কৃষকদের সঙ্গে কথা বললেই অভিযোগের সত্যতা মিলবে। এ ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্তও দাবি করেছেন তারা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ওসিএলএসডি জানান, দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকায় ডিসি ফুড কার্যালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। তাদের আর্থিক সুবিধা না দিলে কোনো ওসিএলএসডি নির্বিঘ্নে দায়িত্ব পালন করতে পারেন না। এমনকি সরেজমিন পরিদর্শন ছাড়াই ছাঁটাইয়ের ধান বরাদ্দ দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

এদিকে সাধারণ কৃষকরা অভিযোগ করেন, ধান নিয়ে গুদামে গেলে আর্দ্রতাসহ বিভিন্ন অজুহাতে তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। পরে সেই একই ধান কম দামে কিনে নিয়ে সিন্ডিকেটের সদস্যরা সরকারি গুদামে সরবরাহ করছেন।

কৃষক আফজাল হোসেন, বকুল হোসেন ও রমজান আলী জানান, তারা একাধিকবার ধান দিতে গিয়ে আর্দ্রতার অজুহাতে ফেরত এসেছেন। অথচ পরে একই ধরনের ধান অন্যদের মাধ্যমে গুদামে গ্রহণ করা হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, নীতিমালা অনুযায়ী কার্ডধারী কৃষকের উপস্থিতিতে ধান কেনার কথা থাকলেও বাস্তবে শত শত কৃষকের কার্ড ব্যবহার করে অন্যরা ধান সরবরাহ করছে। এমনকি যাদের ধান নেই বা যারা ধান বিক্রি করবেন না, তাদের নামও তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। নিজ এলাকার পরিবর্তে পাবনা, নাটোর ও নওগাঁসহ বিভিন্ন জেলা থেকে মোটা ধান এনে সরকারি গুদামে সরবরাহ করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন স্থানীয়রা।

একাধিক সূত্রের দাবি, প্রতি টন ধান সরবরাহে দেড় থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত অবৈধ লেনদেন হচ্ছে। গুদামের সিসিটিভি ফুটেজ, কৃষকদের মোবাইল নম্বর এবং সংরক্ষিত ধানের আর্দ্রতা পরীক্ষা করলেই অভিযোগের সত্যতা উদ্ঘাটিত হতে পারে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, বর্তমানে বাজারে মোটা ধানের দাম প্রতি মণ ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকার মধ্যে থাকলেও সরকার কিনছে ১ হাজার ৪৪০ টাকা মণ দরে। এই মূল্য ব্যবধানের সুযোগ নিয়েই সিন্ডিকেট বিপুল মুনাফা করছে বলে অভিযোগ।

জানা গেছে, চলতি বছর মোহনপুর উপজেলায় ৪৯ টাকা কেজি দরে সাতটি মিল থেকে ২৫৯ মেট্রিক টন চাল এবং ৩৬ টাকা কেজি দরে কৃষকদের কাছ থেকে ৭৮৫ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত এই কার্যক্রম চলবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ক্ষমতাসীন দলের এক জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, রাজনৈতিক পরিচয়ের কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি ইউনিয়নভিত্তিক প্রভাব খাটিয়ে কৃষকদের জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করে তালিকা তৈরি করেছেন। এতে প্রকৃত কৃষকরা বঞ্চিত হয়েছেন। তিনি এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।

তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মোহনপুর সরকারি খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসিএলএসডি) সুজন। তিনি বলেন, “প্রকৃত কৃষক ছাড়া অন্য কারও কাছ থেকে ধান কেনা হয়নি।”

উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা (টিসিএফ) মো. শফিকুল ইসলামও অভিযোগ নাকচ করে বলেন, “ধান সংগ্রহে অনিয়মের কোনো সুযোগ নেই। সকল ধান প্রকৃত কৃষকদের কাছ থেকেই কেনা হয়েছে।”

অন্যদিকে ঘাসিগ্রাম ইউনিয়নের শ্যামপুর, মেলান্দী, আতানারায়ণপুর এবং ধুরইল ইউনিয়নের আমরাইল ও মহব্বতপুর এলাকার প্রায় অর্ধশতাধিক কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের অধিকাংশই জানেন না সরকার কীভাবে ধান সংগ্রহ করে, কত দামে কিনছে কিংবা একজন কৃষক সর্বোচ্চ কত ধান বিক্রি করতে পারেন। তাদের অভিযোগ, সরকারি ধান সংগ্রহ কার্যক্রম সম্পর্কে পর্যাপ্ত প্রচারণার অভাবে প্রকৃত কৃষকরা সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

 

(

By moon24

মমিনুল ইসলাম মুন। সম্পাদক ও প্রকাশক। দেশবার্তা বিডি ২৪. কম। 📲 01740 93 58 70 Email : mominulinqilab@gmail.com deshbartabd86@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *