যে শিক্ষক আলোকিত করেছিলেন একটি গ্রাম, শেষ জীবনে তিনিই অন্ধকারের বাসিন্দা Visit to get the latest news ⏩www.deshbartabd24.com মমিনুল ইসলাম মুন,স্টাফ রিপোর্টার : নিজের উদ্যোগে গড়েছিলেন বিদ্যালয়, শত শত শিক্ষার্থীকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করেছেন; অথচ অবসরের পর বিদ্যুৎহীন টিনের ঘরে মানবেতর জীবন কাটছে তানোরের শিক্ষক নিতাই চন্দ্র বর্মনের। একজন শিক্ষক শুধু পাঠ্যবই পড়ান না, তিনি গড়ে তোলেন একটি প্রজন্ম, বদলে দেন একটি সমাজের ভবিষ্যৎ। কিন্তু সেই শিক্ষকই যদি জীবনের শেষ প্রান্তে এসে অবহেলা, দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই করেন, তবে তা শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের বিবেককে প্রশ্নবিদ্ধ করে। রাজশাহীর তানোর উপজেলার মুণ্ডুমালা পৌর এলাকার জোতগৌরিব গ্রামের শিক্ষক নিতাই চন্দ্র বর্মনের জীবন আজ সেই নির্মম বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি। আজ যে গ্রামে বিদ্যুতের আলো জ্বলে, পাকা রাস্তা রয়েছে, আর প্রতিটি সকাল মুখর থাকে শিক্ষার্থীদের কোলাহলে—কয়েক দশক আগে সেই গ্রাম ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। শিক্ষা ছিল অবহেলিত, যোগাযোগব্যবস্থা ছিল নাজুক, আর নিরক্ষরতার অন্ধকারে ডুবে ছিল পুরো জনপদ। স্থানীয়রা তখন গ্রামটিকে ‘ভূতের গ্রাম’ বলেও ডাকতেন। সেই অন্ধকার দূর করার স্বপ্ন নিয়েই ১৯৮৪ সালে নিজের উদ্যোগে একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করেন নিতাই চন্দ্র বর্মন। অর্থের অভাব ছিল, ছিল না কোনো সরকারি সহায়তা। তবুও থেমে যাননি তিনি। গ্রামের মানুষের সহযোগিতায় তিন কক্ষের একটি বেড়ার ঘর নির্মাণ করে শুরু করেন পাঠদান। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর ১৯৮৭ সালে বিদ্যালয়টি নিবন্ধন লাভ করে। নাম রাখা হয় জোতগৌরিব আদিবাসী প্রাথমিক বিদ্যালয়। মাত্র ৫০০ টাকা মাসিক বেতনে শুরু হয় তার শিক্ষকতা জীবন। পরে সেই বেতন বেড়ে দুই হাজার টাকায় পৌঁছালেও সামান্য আয়ে সংসার চালিয়ে শিক্ষার আলো ছড়ানোর কাজ থেকে কখনো সরে আসেননি তিনি। নিজের স্বাচ্ছন্দ্যের চেয়ে গ্রামের শিশুদের ভবিষ্যৎকেই সবসময় বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তার নিরলস প্রচেষ্টায় একসময়ের অবহেলিত জনপদে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে পড়ে। শত শত শিক্ষার্থী লেখাপড়া শিখে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বদলে গেছে গ্রামের চিত্র এসেছে বিদ্যুৎ, হয়েছে পাকা রাস্তা, উন্নত হয়েছে মানুষের জীবনযাত্রার মান। কিন্তু যে মানুষটির স্বপ্ন ও শ্রমে এই পরিবর্তনের সূচনা, ভাগ্য যেন তার প্রতি ছিল বড়ই নির্মম। ২০১০ সালে চাকরি থেকে অবসরে যান নিতাই চন্দ্র বর্মন। অবসরের তিন বছর পর, ২০১৩ সালে তার প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টি সরকারি হয়। ফলে সরকারি চাকরিজীবীদের মতো কোনো সুযোগ-সুবিধা তার ভাগ্যে জোটেনি। এমনকি বেসরকারি নিয়মে পাওয়ার কথা যে অবসর ভাতাও দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও পাননি বলে জানান তিনি। বর্তমানে নিজের নামে এক শতক জমিও নেই তার। বিদ্যালয়ের পাশের এক টুকরো জমিতে বিদ্যুৎবিহীন ছোট্ট একটি টিনের ঘরে স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস করছেন। নিয়মিত আয়ের কোনো উৎস নেই। কখনো ওষুধ কেনার টাকা থাকে না, কখনো দুবেলা খাবার জোগাড় করতেও হিমশিম খেতে হয়। বয়সের ভারে শরীর ভেঙে পড়লেও বিদ্যালয়ের প্রতি তার ভালোবাসা এতটুকুও কমেনি। এখনও প্রায় প্রতিদিনই হেঁটে চলে যান সেই বিদ্যালয়ে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে শিক্ষার্থীদের খোঁজখবর নেন, তাদের সঙ্গে কথা বলেন, সুযোগ পেলে একটি-দুটি ক্লাসও নেন। যেন বিদ্যালয়টি এখনও তার সবচেয়ে প্রিয় সন্তান। নিতাই চন্দ্র বর্মন এই প্রতিবেদককে বলেন, আমি চেয়েছিলাম গ্রামের ছেলেমেয়েরা যেন পড়াশোনা শিখে মানুষ হয়। আজ তারা মানুষ হয়েছে, এটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। তবে জীবনের এই শেষ সময়ে চিকিৎসা আর সংসার চালানো খুব কষ্ট হয়ে গেছে। অনেক সময় ওষুধ কেনার টাকাও থাকে না। বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, নিতাই স্যার না থাকলে এই বিদ্যালয়ের অস্তিত্বই থাকত না। তিনি শুধু একটি স্কুল গড়েননি, একটি প্রজন্মকে গড়ে তুলেছেন। আজ তার জীবনসংগ্রাম দেখে সত্যিই কষ্ট হয়। তিনি গ্রামের মানুষকে আলোকিত করেছেন, অথচ নিজের জীবনটাই আজ অন্ধকারে ঢাকা। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, নিতাই চন্দ্র বর্মনের হাত ধরেই জোতগৌরিব গ্রামে শিক্ষার নবযাত্রা শুরু হয়েছিল। তাদের মতে, এমন একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকের সম্মানজনক জীবন নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়েরই নৈতিক দায়িত্ব। শিক্ষাবিদদের মতে, ব্যক্তিগত স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে যাঁরা শিক্ষার আলো ছড়িয়েছেন, তাঁদের শেষ জীবন যেন অবহেলা ও দারিদ্র্যে না কাটে, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের পাশাপাশি সমাজেরও দায়িত্ব। কারণ একজন শিক্ষককে সম্মান জানানো মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বপ্নকে সম্মান জানানো। নিতাই চন্দ্র বর্মনের গল্প শুধু একজন শিক্ষকের ব্যক্তিগত সংগ্রামের গল্প নয়; এটি আত্মত্যাগ, মানবিকতা এবং সমাজের নীরব ঋণের এক অনন্য দলিল। যে মানুষটি একদিন একটি গ্রামের অন্ধকার দূর করেছিলেন, তার নিজের জীবনের শেষ অধ্যায়েও যেন আলোর ছোঁয়া আসে -এটাই আজ এলাকাবাসীর প্রত্যাশা। Post navigation রাজশাহীতে ক্যাডেট এএসআই নিয়োগের শারীরিক সক্ষমতা যাচাই শেষ মাদকের আস্তানায় গিয়ে সরাসরি সতর্কবার্তা দিলেন তৌহিদুর ইসলাম রেজা