ভালোবাসা, ক্ষত আর প্রায়শ্চিত্তের গল্প: ফিরে দেখা ‘আওয়ারাপন’

দেশবার্তা বিডি ২৪. কম,বিনোদন ডেস্ক

কিছু সিনেমা মুক্তির সময় হয়তো বক্স অফিসে ঝড় তোলে না, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দর্শকের হৃদয়ে এমনভাবে জায়গা করে নেয় যে একসময় সেগুলো হয়ে ওঠে ‘কাল্ট ক্লাসিক’। ২০০৭ সালে মুক্তি পাওয়া মোহিত সুরি পরিচালিত ‘আওয়ারাপন’ তেমনই একটি সিনেমা। ইমরান হাশমি অভিনীত এই ছবি নিছক অপরাধজগতের গল্প নয়; বরং ভালোবাসা হারানোর যন্ত্রণা, অপরাধবোধ, অনুতাপ এবং আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে একজন মানুষের আত্মিক মুক্তির গল্প।

মুক্তির প্রায় দুই দশক পরও ‘আওয়ারাপন’-এর আবেগ, সংলাপ ও গান দর্শকের মনে সমানভাবে আলোচিত। বিশেষ করে ইমরান হাশমির শিবম পন্ডিত চরিত্রটি তার অভিনয়জীবনের অন্যতম স্মরণীয় চরিত্র হিসেবে বিবেচিত হয়। তার ক্যারিয়ারের প্রচলিত রোমান্টিক ইমেজ থেকে বেরিয়ে এই ছবিতে তিনি তুলে ধরেছিলেন এক নীরব, কঠিন ও ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়া মানুষের প্রতিচ্ছবি।

শিবম পন্ডিত: অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া এক মানুষ

‘আওয়ারাপন’-এর গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র শিবম পন্ডিত। হংকংয়ের প্রভাবশালী অপরাধী ভরত মালিকের বিশ্বস্ত সহযোগী হিসেবে সে নির্মম ও ভয়ংকর। কিন্তু এই কঠোরতার আড়ালে লুকিয়ে আছে গভীর এক ক্ষত।

শিবমের জীবনে একসময় ভালোবাসা এসেছিল। সেই ভালোবাসার নাম আলিয়া। কিন্তু সেই সম্পর্কের করুণ পরিণতি তাকে এমনভাবে ভেঙে দেয় যে ভালোবাসা, ধর্ম, ঈশ্বর—সবকিছুর ওপর থেকেই তার বিশ্বাস হারিয়ে যায়। এরপর অপরাধজগতই হয়ে ওঠে তার বেঁচে থাকার একমাত্র আশ্রয়।

শিবমের চরিত্রের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য এখানেই—বাইরে সে একজন নির্মম অপরাধী, অথচ ভেতরে সে একজন আহত প্রেমিক, যে অতীতের স্মৃতি থেকে কোনোভাবেই বেরিয়ে আসতে পারে না।

আলিয়া: যে ভালোবাসা শিবমকে বদলে দিয়েছিল

ফ্ল্যাশব্যাকে উঠে আসে শিবম ও আলিয়ার প্রেমের গল্প। আলিয়া ছিল শান্ত, বিশ্বাসী ও মানবিক এক তরুণী। শিবমের অপরাধজগতের পরিচয় জানার পরও সে বিশ্বাস করত, ভালোবাসার মাধ্যমে এই মানুষটিকে বদলে দেওয়া সম্ভব।

কিন্তু তাদের সম্পর্কের পথে আসে পরিবার, সামাজিক বাস্তবতা ও ধর্মীয় বিভাজনের কঠিন দেয়াল। এক পর্যায়ে আলিয়াকে হারানোর ঘটনা শিবমের জীবনে এমন গভীর ক্ষত তৈরি করে, যার প্রভাব থেকে সে আর কখনো বেরিয়ে আসতে পারে না।

আলিয়াকে হারানোর পর শিবম যেন নিজের ভেতরের মানুষটিকেও হারিয়ে ফেলে। তার জীবনে ভালোবাসার জায়গা নেয় প্রতিশোধ, হতাশা ও অপরাধজগতের অন্ধকার।

রিয়ার আগমন এবং বদলে যাওয়ার শুরু

গল্পের পরবর্তী অধ্যায়ে শিবমের জীবনে আসে রিয়া। ভরত মালিকের নির্দেশে রিয়ার ওপর নজর রাখার দায়িত্ব পায় সে। মালিকের সন্দেহ ছিল, রিয়ার অন্য একজনের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে।

কিন্তু রিয়াকে কাছ থেকে দেখার পর শিবম বুঝতে পারে, বিষয়টি তার ধারণার মতো নয়। রিয়া নিজেও পরিস্থিতির শিকার। সে বন্দিদশা থেকে বেরিয়ে নিজের ভালোবাসার মানুষ বিলালের সঙ্গে নতুন জীবন শুরু করতে চায়।

রিয়ার অসহায়ত্ব শিবমের বহুদিনের চাপা মানবিকতাকে আবার জাগিয়ে তোলে। রিয়ার মধ্যে সে যেন নিজের হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসার প্রতিচ্ছবি দেখতে পায়।

এখান থেকেই শুরু হয় শিবমের ভেতরের সবচেয়ে বড় লড়াই—একদিকে তার অপরাধজগতের আনুগত্য, অন্যদিকে বিবেক ও মানবিকতা।

ভালোবাসার জন্য শেষ লড়াই

রিয়া ও বিলালের সম্পর্কের কথা জানতে পেরে ভরত মালিক যখন রিয়াকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন শিবমের সামনে দুটি পথ খোলা থাকে। সে চাইলে নিজের পুরোনো প্রভুর নির্দেশ পালন করতে পারে। অথবা একজন নিরপরাধ মানুষকে বাঁচানোর জন্য নিজের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।

শিবম দ্বিতীয় পথটিই বেছে নেয়।

একসময় যে মানুষ অপরাধজগতের হয়ে নির্মম কাজ করেছে, সেই মানুষই শেষ পর্যন্ত সেই জগতের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায়। রিয়া ও বিলালকে মুক্ত করার জন্য সে নিজের জীবন বাজি রাখে।

চূড়ান্ত সংঘর্ষে শিবম একাই ভরত মালিকের লোকজনের বিরুদ্ধে লড়াই করে। রিয়া ও বিলালকে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিতে গিয়ে সে গুরুতরভাবে আহত হয়।

মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে শিবমের মুখে যে প্রশান্তি ফুটে ওঠে, সেটিই সিনেমার সবচেয়ে শক্তিশালী মুহূর্তগুলোর একটি। কারণ শেষ পর্যন্ত সে বুঝতে পারে—অন্য একজন মানুষের জীবন বাঁচানোর মধ্য দিয়েই হয়তো নিজের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করার সুযোগ পেয়েছে।

ইমরান হাশমির ক্যারিয়ারে অন্যরকম এক অধ্যায়

‘আওয়ারাপন’ ইমরান হাশমির ক্যারিয়ারে গুরুত্বপূর্ণ একটি বাঁক। এর আগে তার ওপর ‘সিরিয়াল কিসার’ ধরনের একটি জনপ্রিয় ইমেজ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু শিবম পন্ডিত চরিত্রে তিনি সেই পরিচিত গণ্ডি থেকে বেরিয়ে আসেন।

তার অভিনয়ে শিবমের নীরবতা, হতাশা, রাগ, ভালোবাসা ও অপরাধবোধ একসঙ্গে ধরা পড়ে। বিশেষ করে সংলাপের চেয়ে চোখের অভিব্যক্তি ও নীরব অভিনয়ের মাধ্যমে চরিত্রটির ভেতরের যন্ত্রণা প্রকাশ করার বিষয়টি দর্শকের প্রশংসা কুড়ায়।

শিবম এমন এক চরিত্র, যে খুব বেশি কথা বলে না; কিন্তু তার নীরবতাই যেন পুরো গল্প বলে দেয়।

গানে গানে বেঁচে আছে ‘আওয়ারাপন’

সিনেমাটির জনপ্রিয়তার অন্যতম বড় কারণ এর সংগীত। প্রীতমের সংগীত পরিচালনায় তৈরি গানগুলো সিনেমাটির আবেগকে আরও গভীর করে তুলেছিল।

‘তো ফির আও’, ‘তেরা মেরা রিশতা’ এবং ‘মাহিয়া’—এই গানগুলো মুক্তির পর থেকেই শ্রোতাদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। বিশেষ করে বিষাদময় প্রেম ও বিচ্ছেদের অনুভূতির সঙ্গে গানগুলোর সুর ও কথা দর্শকের আবেগকে আরও তীব্র করে তোলে।

আজও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিংবা ব্যক্তিগত প্লেলিস্টে ‘আওয়ারাপন’-এর গান ফিরে আসে। সময় বদলেছে, সংগীতের ধরন বদলেছে, কিন্তু এই গানগুলোর আবেগ অনেক শ্রোতার কাছে এখনও পুরোনো হয়নি।

কেন ‘আওয়ারাপন’ এখনো মনে রাখে দর্শক?

‘আওয়ারাপন’-এর বিশেষত্ব হলো—এখানে নায়ককে প্রচলিত অর্থে নিখুঁত বা আদর্শ মানুষ হিসেবে দেখানো হয়নি। শিবম ভুল করেছে, অপরাধ করেছে, ভালোবাসা হারিয়েছে এবং অন্ধকারের মধ্যে ডুবে গেছে।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার ভেতরের মানবিক সত্তা পুরোপুরি মারা যায়নি। একজন নিরপরাধ মানুষকে বাঁচানোর সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে সেই মানবিকতাই আবার ফিরে আসে।

এই জায়গাটিই ‘আওয়ারাপন’-কে শুধু একটি অ্যাকশন-রোমান্টিক সিনেমার সীমার বাইরে নিয়ে যায়। এটি হয়ে ওঠে একজন মানুষের পতন, অনুতাপ এবং শেষ পর্যন্ত আত্মমুক্তির গল্প।

প্রায় দুই দশক পরও যে গল্প পুরোনো হয়নি

২০০৭ সালে মুক্তি পাওয়া ‘আওয়ারাপন’ সময়ের সঙ্গে দর্শকের কাছে নতুন অর্থ পেয়েছে। মুক্তির সময় যে ছবিকে অনেকেই সাধারণ অ্যাকশন-রোমান্টিক সিনেমা হিসেবে দেখেছিলেন, পরবর্তী সময়ে সেটিই ভক্তদের কাছে হয়ে উঠেছে আবেগঘন এক কাল্ট সিনেমা।

শিবম পন্ডিতের গল্প আসলে একটি প্রশ্ন রেখে যায়—একজন মানুষ কতটা অন্ধকারে হারিয়ে গেলে তাকে আর ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়? আর যদি ফিরে আসার সুযোগ আসে, তবে তার মূল্য কতটা?

‘আওয়ারাপন’ সেই প্রশ্নের উত্তর দেয় ভালোবাসা ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে। শিবম শেষ পর্যন্ত নিজের জীবন দিয়ে প্রমাণ করে, মানুষ যতই অপরাধে ডুবে যাক, তার ভেতরের মানবিকতা পুরোপুরি নিঃশেষ হয়ে যায় না।

সেই কারণেই প্রায় দুই দশক পরও ‘আওয়ারাপন’ কেবল একটি পুরোনো সিনেমার নাম নয়; এটি হয়ে আছে হারানো ভালোবাসা, অনুতাপ এবং আত্মমুক্তির এক বিষাদময় চলচ্চিত্রকাব্য।

By চাঁদ২৪

মমিনুল ইসলাম মুন। সম্পাদক ও প্রকাশক। দেশবার্তা বিডি ২৪. কম। 📲 01740 93 58 70 বার্তাকক্ষ-01722 320196 Email : mominulinqilab@gmail.com deshbartabd86@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *