তানোরের ইউএনও নাইমা খানকে ঘিরে অভিযোগের ভিত্তি কী? নথি-প্রমাণ ছাড়াই গুরুতর দাবি নিয়ে প্রশ্ন

 মমিনুল ইসলাম মুন নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী :

রাজশাহীর তানোর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাইমা খানকে জড়িয়ে দুই কোটি টাকা আত্মসাৎ, ফ্যামিলি কার্ডে অনিয়ম, অবৈধ লেনদেনসহ একাধিক গুরুতর অভিযোগ তুলে একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও সচেতন মহলে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

গত ১১ আগস্ট প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে ইউএনও নাইমা খানের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ উত্থাপন করা হলেও এসব অভিযোগের সমর্থনে কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন, নিরীক্ষা নথি, মামলা সংক্রান্ত তথ্য কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য প্রতিবেদনে উপস্থাপন করা হয়নি। প্রতিবেদনে মূলত কথিত সূত্র, কয়েকজন ব্যক্তির বক্তব্য ও রাজনৈতিক পরিচয়ধারী ব্যক্তিদের অভিযোগের ভিত্তিতে বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে।

‘দুই কোটি টাকা লোপাট’-এর অভিযোগের প্রমাণ কোথায়?

প্রতিবেদনের সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো তানোরে একটি প্রকল্পে প্রায় দুই কোটি টাকা আত্মসাতের দাবি। তবে এ অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রকল্পের নাম, বরাদ্দের নথি, প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রতিবেদন, সরকারি অডিট রিপোর্ট কিংবা তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি।

শুধু একজন রাজনৈতিক নেতার বক্তব্যের বরাত দিয়ে এমন গুরুতর অভিযোগ প্রকাশ করা হলে সেটির সত্যতা যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়ে যায় বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।

ফ্যামিলি কার্ড নিয়েও প্রশ্ন

প্রতিবেদনে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ করা হয়েছে। তবে কার্ডের সরকারি তালিকা, নির্ধারিত যোগ্যতার মানদণ্ড এবং অভিযোগ করা ব্যক্তিদের তালিকা তুলনা করে কোনো তথ্য-উপাত্ত প্রতিবেদনে দেওয়া হয়নি।

ফলে ফ্যামিলি কার্ডের ক্ষেত্রে প্রকৃত অনিয়ম হয়েছে কি না, নাকি প্রশাসনিক যাচাই-বাছাইয়ের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে অভিযোগ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে—তা নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ নেই।

অভিযোগ আর প্রমাণ এক বিষয় নয়

একজন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঘুষ, অর্থ আত্মসাৎ কিংবা অবৈধ লেনদেনের মতো অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্যের পাশাপাশি সরকারি নথি, তদন্ত প্রতিবেদন ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রকাশ করা জরুরি।

এক্ষেত্রে কোনো অভিযোগ প্রকাশিত হলেই তা সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় না। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের।

নাইমা খানের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারের অভিযোগ উঠলে তদন্ত দাবি

স্থানীয়দের একটি অংশের দাবি, একজন কর্মকর্তাকে নিয়ে ধারাবাহিকভাবে অভিযোগ প্রকাশের আগে অভিযোগগুলোর তথ্য-উপাত্ত যাচাই করা প্রয়োজন। কোনো কর্মকর্তা প্রকৃতপক্ষে অনিয়মে জড়িত থাকলে যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে তা বেরিয়ে আসা উচিত। আবার অভিযোগ মিথ্যা হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সুনাম ক্ষুণ্ন করার দায়ও নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

এদিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ইউএনও নাইমা খানের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হলেও তাঁর বিস্তারিত লিখিত বক্তব্য প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়নি।

‘কপি-পেস্ট সাংবাদিকতা’ নিয়েও প্রশ্ন

স্থানীয় সাংবাদিক মহলের কেউ কেউ অভিযোগ করছেন, বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বক্তব্য, পুরোনো অভিযোগ কিংবা অন্যত্র প্রকাশিত তথ্য যথাযথভাবে যাচাই না করে পুনরায় সাজিয়ে প্রকাশ করার প্রবণতা সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।

তবে কোনো নির্দিষ্ট প্রতিবেদনকে ‘কপি-পেস্ট’ হিসেবে চূড়ান্তভাবে আখ্যা দেওয়ার আগে মূল প্রতিবেদন, প্রকাশের সময়, ভাষাগত মিল এবং তথ্যের উৎস তুলনা করে প্রমাণ উপস্থাপন করা প্রয়োজন।

নিরপেক্ষ তদন্তই হতে পারে সমাধান

নাইমা খান প্রকৃতপক্ষে কোনো অনিয়মে জড়িত কি না, নাকি তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন—তা নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের পরিবর্তে নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়াই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য সমাধান।

প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ চাইলে ফ্যামিলি কার্ডের তালিকা, প্রকল্পের হিসাব, সরকারি বরাদ্দ, বাস্তবায়ন নথি ও সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রকৃত সত্য জনসম্মুখে তুলে ধরতে পারে।

অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত ইউএনও নাইমা খানকে অভিযুক্ত হিসেবে চূড়ান্তভাবে উপস্থাপন না করে তাঁর বক্তব্য, সরকারি নথি ও নিরপেক্ষ তদন্তের ফলাফলকে গুরুত্ব দেওয়াই দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার পরিচয়।

By চাঁদ২৪

মমিনুল ইসলাম মুন। সম্পাদক ও প্রকাশক। দেশবার্তা বিডি ২৪. কম। 📲 01740 93 58 70 বার্তাকক্ষ-01722 320196 Email : mominulinqilab@gmail.com deshbartabd86@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *