তানোর পল্লী বিদ্যুৎ কার্যালয়ে কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী:

অবৈধ সেচ সংযোগ, ভূতুড়ে বিল, জরিমানা বাণিজ্য ও দালাল সিন্ডিকেটে অতিষ্ঠ গ্রাহক; বিভাগীয় তদন্তের দাবি

রাজশাহীর তানোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জোনাল কার্যালয়ের বিরুদ্ধে অবৈধ সেচ সংযোগ, গ্রাহক হয়রানি, ভূতুড়ে বিদ্যুৎ বিল, জরিমানার নামে অর্থ আদায় এবং দালাল সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সেবা বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশের যোগসাজশে গড়ে ওঠা একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট অফিসের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে সাধারণ ও প্রান্তিক গ্রাহকদের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে।

স্থানীয় সূত্র, ভুক্তভোগী গ্রাহক এবং কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর সংরক্ষণে সরকারের নির্দেশনা ও প্রচলিত সেচ নীতিমালা উপেক্ষা করে তানোরের বিভিন্ন এলাকায় গভীর ও অগভীর নলকূপে অবৈধভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সেচ কমিটির অনুমোদন ছাড়াই অন্তত ৪৫টি গভীর ও অগভীর নলকূপে সংযোগ দিয়ে প্রায় পাঁচ কোটি টাকার অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে।

এদিকে আবাসিক সংযোগ ব্যবহার করে কৃষিজমিতে সেচ দেওয়ার অভিযোগে প্রায় ১৫ হাজার কৃষকের কাছ থেকে জনপ্রতি এক হাজার ৫০০ টাকা করে জরিমানা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। কৃষকদের ভাষ্য, খরাপ্রবণ এ অঞ্চলে বিএমডিএর অনেক গভীর নলকূপে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় তারা বাধ্য হয়ে আবাসিক সংযোগের সাবমার্সিবল পাম্প দিয়ে সবজি ও বোরো ক্ষেতে সেচ দিয়েছেন। কিন্তু সংযোগ বিচ্ছিন্ন না করে জরিমানার ভয় দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ আদায় করা হয়েছে।

বাধাইড় ইউনিয়নের শিবরামপুর গ্রামের এক কৃষক, পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে, বলেন, “ছয় মাস আগে বৈধ আবাসিক সংযোগের জন্য আবেদন করেছি। বহুবার অফিসে গিয়েও সংযোগ পাইনি। পরে জানতে পারি, টাকা না দেওয়ায় আবেদনটি বাতিল করা হয়েছে। অথচ অনেকেই অতিরিক্ত অর্থ দিয়ে সহজেই সংযোগ পেয়েছেন।”

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, তানোর পল্লী বিদ্যুৎ কার্যালয়ে একটি সক্রিয় দালাল চক্র দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার করে আসছে। রাজনৈতিক পরিচয়ধারী কথিত টেকনিশিয়ান (লাইনম্যান) ও বহিরাগত দালালরা অফিসে অবস্থান করে বিভিন্ন দাপ্তরিক কাজ নিয়ন্ত্রণ করেন। সাধারণ গ্রাহকরা সরাসরি সেবা না পেয়ে দালালদের মাধ্যমে কাজ করতে বাধ্য হন। দালালের সহযোগিতা না নিলে আবেদনপত্রে নানা ত্রুটি দেখিয়ে মাসের পর মাস ফাইল আটকে রাখা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া থ্রি-ফেজ মিটার প্রতিস্থাপন, বৈদ্যুতিক খুঁটি স্থানান্তর কিংবা অন্যান্য সেবার জন্য সরকারি ফি জমা দেওয়ার পরও দীর্ঘ সময় কাজ না হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নথিপত্র হারিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে দাবি ভুক্তভোগীদের। তবে অতিরিক্ত অর্থ দিলে অল্প সময়ের মধ্যেই কাজ সম্পন্ন হয়ে যায় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

গ্রাহকদের আরেকটি বড় অভিযোগ, ভূতুড়ে বিদ্যুৎ বিল এবং মিটারের সিল কেটে হয়রানি করা। অভিযোগ রয়েছে, দালাল চক্র রাতের আঁধারে মিটারের সিল নষ্ট করে পরে মামলার ভয় দেখিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করে। সম্প্রতি অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিলের প্রতিবাদে ক্ষুব্ধ গ্রাহকরা তানোর পল্লী বিদ্যুৎ কার্যালয় ঘেরাও করে বিক্ষোভও করেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সেচ মোটরের মালিক অভিযোগ করেন, সংযোগ সচল রাখতে পল্লী বিদ্যুতের কিছু অসাধু কর্মচারীকে প্রতি মাসে কোনো রশিদ ছাড়াই নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ দিতে হয়।

এদিকে স্থানীয় কয়েকজন গ্রাহক অভিযোগ করেন, বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্ত ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) রেজাউল ইসলাম দায়িত্ব গ্রহণের পর অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ আরও বেড়েছে। তাদের দাবি, অফিসে কোনো কাজ করতে গেলে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হয় এবং সরকারি কাজে বরাদ্দ জ্বালানি তেল ব্যবহারের ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন এখনো প্রকাশিত হয়নি।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তানোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জোনাল কার্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) রেজাউল ইসলাম বলেন, “গ্রাহক হয়রানি কিংবা অবৈধ সংযোগের কোনো সুযোগ নেই। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, অতীতেও এ ধরনের আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন হয়নি। তাদের দাবি, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে একটি স্বাধীন বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। একই সঙ্গে দালালমুক্ত, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক গ্রাহকসেবা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

By moon24

মমিনুল ইসলাম মুন। সম্পাদক ও প্রকাশক। দেশবার্তা বিডি ২৪. কম। 📲 01740 93 58 70 Email : mominulinqilab@gmail.com deshbartabd86@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *