তানোরের অফিস পাড়ায় ষড়যন্ত্রের অভিযোগ, ইমনকে সাময়িক বরখাস্তে মিশ্র প্রতিক্রিয়া মমিনুল ইসলাম মুন, নিজস্ব প্রতিনিধি রাজশাহী : রাজশাহীর তানোর উপজেলা ভূমি অফিসের মিউটেশন কাম সার্টিফিকেট অ্যাসিস্ট্যান্ট ইমরুল কাশেম ইমনকে সাময়িক বরখাস্তের ঘটনায় এলাকায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। আর্থিক লেনদেনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া এবং এ নিয়ে একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে সংবাদ প্রচারের পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৭ আগস্ট তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। রাজশাহী জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলামের স্বাক্ষরিত অফিস আদেশে এ তথ্য জানা গেছে। তবে সাময়িক বরখাস্তের বিষয়টি নিয়ে তানোরের সচেতন মহলে যেমন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা চলছে, তেমনি প্রচারিত ভিডিও, অভিযোগের সত্যতা এবং ঘটনাটির সঙ্গে তানোর ভূমি অফিসের প্রকৃত সংশ্লিষ্টতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, সাম্প্রতিক সময়ে তানোরের বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে একের পর এক অভিযোগ ও সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে। তাঁদের দাবি, এর মধ্যে কিছু অভিযোগের পেছনে ব্যক্তিগত স্বার্থ, সুবিধা আদায়ের চেষ্টা কিংবা প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশ্য রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। ‘সুবিধা না পেলেই অভিযোগ-সংবাদ’—স্থানীয়দের প্রশ্ন স্থানীয় কয়েকজন সচেতন নাগরিকের দাবি, কোনো কর্মকর্তা আইন অনুযায়ী কাজ করে অনৈতিক সুবিধা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁকে বিভিন্নভাবে চাপের মুখে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে—এমন অভিযোগও তাঁরা শুনছেন। তাঁদের ভাষ্য, কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে প্রকৃত অনিয়মের অভিযোগ থাকলে অবশ্যই তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কিন্তু ব্যক্তিগত বিরোধ, জমিজমা-সংক্রান্ত স্বার্থ কিংবা কোনো ধরনের অনৈতিক সুবিধা না পাওয়ার কারণে যদি কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ তৈরি করা হয়, সেটিও প্রশাসনের গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত। স্থানীয়দের কেউ কেউ বলছেন, ‘অভিযোগ করলেই অপরাধী’এমন ধারণা প্রশাসনিক ন্যায়বিচারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়াই হওয়া উচিত। কথিত এক গণমাধ্যমকর্মীর ভূমিকা নিয়েও আলোচনা তানোরের স্থানীয় পর্যায়ে কর্মরত এক কথিত গণমাধ্যমকর্মীর ভূমিকা নিয়েও আলোচনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন কয়েকজন সচেতন নাগরিক। তাঁদের অভিযোগ, ওই গণমাধ্যমকর্মী বিভিন্ন সময় ভূমি ও জমিজমা-সংক্রান্ত বিষয়ে সক্রিয় থাকেন এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সুবিধা না পেলে তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ বা সংবাদ প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়—এমন অভিযোগ স্থানীয়ভাবে রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, জেলা শহরের বিভিন্ন গণমাধ্যমকর্মীর সঙ্গে ওই ব্যক্তির যোগাযোগ থাকায় তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কখনো কখনো সংবাদ প্রকাশিত হয়। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমকর্মীর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, কোনো সাংবাদিক বা গণমাধ্যমকর্মী যদি ব্যক্তিগত স্বার্থে সংবাদমাধ্যমকে ব্যবহার করে থাকেন, তাহলে সেটিও তদন্তের আওতায় আসা উচিত। একই সঙ্গে প্রকৃত সাংবাদিকতার স্বার্থে অভিযোগের সত্যতা যাচাই, অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য গ্রহণ এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পরীক্ষা করে সংবাদ প্রকাশের আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা। ইউএনও ও তহসিলদারকে ঘিরেও বিতর্ক, এর আগে তানোর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাইমা খান এবং তানোর তহসিল অফিসের তহসিলদার তানভীরকে নিয়েও বিভিন্ন অভিযোগ ও সংবাদ প্রকাশের ঘটনা স্থানীয়ভাবে আলোচনায় আসে। স্থানীয়দের একাংশ তখন অভিযোগগুলোর সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ওই কর্মকর্তাদের পক্ষে অবস্থান নেন। তাঁদের দাবি, তাঁরা সাধারণ মানুষের সঙ্গে ভালো আচরণ করেন এবং নিয়ম অনুযায়ী সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে এসব বিষয়ে ওঠা অভিযোগের সত্যতা বা অসত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করেন স্থানীয়রা। ইমনের ভিডিও নিয়েও প্রশ্ন ইমরুল কাশেম ইমনের সাময়িক বরখাস্তের ঘটনায় সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে প্রচারিত ভিডিও ফুটেজ নিয়ে। স্থানীয়দের একাংশের দাবি, বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে তানোর ভূমি অফিসের কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে যে সংবাদ প্রচার করা হয়েছে, সেখানে ব্যবহৃত ভিডিও ফুটেজে পবা ভূমি অফিসের চিত্র দেখা গেছে। ফলে ভিডিওটি কোথায় ধারণ করা হয়েছে, এতে থাকা ব্যক্তি কে এবং ইমনের সঙ্গে এর সংশ্লিষ্টতা কী—এসব বিষয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে ভিডিওটির প্রকৃত স্থান, সময় ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় তদন্ত ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। স্থানীয়দের প্রশ্ন, ভিডিওটি যদি তানোর ভূমি অফিসের না হয়ে থাকে, তাহলে সেটিকে ইমনের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ হিসেবে কীভাবে বিবেচনা করা হলো? আর ভিডিওটি যদি তানোর অফিসেরই হয়ে থাকে, তাহলে সেটির সত্যতা ও প্রেক্ষাপট যাচাই করা হয়েছে কি না, সেটিও পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন অর্থ লেনদেন মানেই কি অনিয়ম? স্থানীয়দের আরও দাবি, ভূমি অফিসে সব ধরনের অর্থ লেনদেন একই প্রকৃতির নয়। বর্তমানে নামজারি-সংক্রান্ত অধিকাংশ সরকারি ফি অনলাইনে পরিশোধের সুযোগ থাকলেও কিছু সরকারি রাজস্ব, খাস সম্পত্তি, ইজারা ও অন্যান্য নির্ধারিত কার্যক্রমে সরকারি বিধি অনুযায়ী অর্থ গ্রহণের ব্যবস্থা রয়েছে। তাই কোনো ভিডিওতে টাকা লেনদেনের দৃশ্য দেখা গেলেই সেটিকে অবৈধ লেনদেন হিসেবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে—টাকা কার কাছ থেকে, কী কারণে, কোন কাজের জন্য, কত টাকা এবং সরকারি নিয়ম অনুযায়ী গ্রহণ করা হয়েছিল কি না—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ‘সৎ কর্মকর্তারা যেন ষড়যন্ত্রের শিকার না হন’, তানোরের সচেতন নাগরিকদের দাবি, সরকারি দপ্তরে কর্মরত কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তদন্ত হতেই হবে। কিন্তু তদন্তের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা গণমাধ্যমে অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা হলে একজন সৎ কর্মকর্তার সামাজিক ও পেশাগত মর্যাদা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাঁদের ভাষ্য, তানোরের বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে এমন অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন, যারা সাধারণ মানুষকে হয়রানি না করে নিয়ম অনুযায়ী সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তাঁদের কেউ অনৈতিক সুবিধা নিতে বা দিতে রাজি না হওয়ায় কোনো স্বার্থান্বেষী মহলের বিরাগভাজন হচ্ছেন কি না, সেটিও প্রশাসনের খতিয়ে দেখা উচিত। একজন সচেতন নাগরিক বলেন, “অপরাধী হলে শাস্তি চাই, কিন্তু নিরপরাধ হলে তাকে শাস্তির মুখে ঠেলে দেওয়া যাবে না। তানোরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই সেটি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হওয়া দরকার।” নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি, স্থানীয়দের মতে, তানোরের অফিসপাড়ায় কোনো ধরনের স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী বা ব্যক্তির প্রভাব থাকলে তা প্রশাসনের জন্য যেমন ক্ষতিকর, তেমনি সাধারণ মানুষের সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট, গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ এবং অভিযোগকারীদের পরিচয় ও স্বার্থ—সবকিছু যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। তাঁদের প্রত্যাশা, কোনো কর্মকর্তা সত্যিই অনিয়মে জড়িত থাকলে তিনি যেন কোনোভাবেই ছাড় না পান; আবার কোনো কর্মকর্তা সৎভাবে দায়িত্ব পালন করলে ব্যক্তিগত স্বার্থ, চাপ কিংবা অপপ্রচারের কারণে যেন তাঁর বিরুদ্ধে অন্যায় ব্যবস্থা না নেওয়া হয়। ইমরুল কাশেম ইমনের সাময়িক বরখাস্তের ঘটনাতেও প্রচারিত ভিডিও, অভিযোগের উৎস, সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও প্রকৃত ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল। তাঁদের মতে, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ‘অভিযোগ নয়, প্রমাণ’ হওয়া উচিত মূল ভিত্তি। একই সঙ্গে গণমাধ্যমেরও উচিত কোনো অভিযোগ প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য নেওয়া এবং তথ্য-উপাত্ত যাচাই করা। Post navigation রাজশাহীতে ক্যাডেট এসআই পদে নির্বাচিতদের প্রশিক্ষণ-পূর্ব ব্রিফিং তানোরের বিল কুমারী বিল পরিদর্শনে বিভাগীয় কমিশনার মোঃ ইউসুফ আলী ও জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম