বিশেষ জুমার নিবন্ধ,,, মৃত্যুশয্যায় আলকামা (রা.) ও জিভের জড়তা | ইবাদতের পাশাপাশি কেন পিতা-মাতার সন্তুষ্টি একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় সম্পদ দেশবার্তা বিডি২৪.কম,ইসলামিক ডেস্ক : জুমার দিন মুসলমানের জীবনে এক অনন্য তাৎপর্য বহন করে। এটি কেবল সাপ্তাহিক ইবাদতের দিন নয়; বরং আত্মসমালোচনা, আত্মশুদ্ধি এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক মহামূল্যবান সুযোগ। এ দিন মসজিদে খুতবা শোনা, কোরআন তিলাওয়াত, দরুদ, দোয়া ও নেক আমলের পাশাপাশি নিজের পারিবারিক দায়িত্ব ও মানুষের প্রতি আচরণ নিয়েও গভীরভাবে ভাবার আহ্বান জানানো হয়। আমাদের সমাজে অনেকেই নামাজ, রোজা, দান-সদকাসহ বিভিন্ন ইবাদতে যত্নবান হলেও মা-বাবার অধিকার আদায়ে অবহেলা করেন। অথচ ইসলামে আল্লাহ তাআলার একত্ববাদ ঘোষণার পরপরই পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন— “তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন, তোমরা একমাত্র তাঁরই ইবাদত করবে এবং পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে।” (সূরা আল-ইসরা: ২৩) আরেক আয়াতে এসেছে— “আমার প্রতি এবং তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। আমার কাছেই তোমাদের প্রত্যাবর্তন।” (সূরা লুকমান: ১৪) এই শিক্ষা উপলব্ধি করতেই মুসলিম সমাজে একটি বহুল প্রচলিত শিক্ষণীয় বর্ণনা আলোচিত হয়, যা আলকামা (রা.)-এর ঘটনা নামে পরিচিত। ইবাদতে অগ্রগামী এক সাহাবির শেষ মুহূর্ত প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, আলকামা (রা.) ছিলেন অত্যন্ত পরহেজগার একজন সাহাবি। নিয়মিত নামাজ, নফল রোজা ও দান-সদকার মাধ্যমে তিনি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করতেন। জীবনের শেষ সময়ে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। মৃত্যুশয্যায় তাঁর স্ত্রী রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে খবর পাঠান। নবীজি (সা.) কয়েকজন সাহাবিকে পাঠান, যাতে তাঁরা আলকামাকে কালেমার তালকিন দেন। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে তিনি বারবার চেষ্টা করেও কালেমা উচ্চারণ করতে পারছিলেন না। ঠোঁট নড়ছিল, অথচ জিহ্বা যেন অচল হয়ে গিয়েছিল। যে কারণ সামনে এলো ঘটনাটি জানার পর রাসুলুল্লাহ (সা.) জানতে চান, তাঁর মা জীবিত আছেন কি না। জানা যায়, তাঁর বৃদ্ধা মা জীবিত ছিলেন। তাঁকে ডেকে আনা হলে তিনি বলেন, ছেলে ইবাদতগুজার হলেও স্ত্রীর কথাকে প্রায়ই তাঁর ওপর প্রাধান্য দিত এবং এতে তিনি গভীরভাবে কষ্ট পেয়েছিলেন। সে কারণে তিনি সন্তানের ওপর সন্তুষ্ট ছিলেন না। বর্ণনায় বলা হয়, নবীজি (সা.) তাঁকে সন্তানের প্রতি ক্ষমাশীল হতে উৎসাহিত করেন। মা আন্তরিকভাবে ক্ষমা করে দিলে আলকামা (রা.) সহজেই কালেমা পাঠ করতে সক্ষম হন এবং ঈমানের সঙ্গে মৃত্যুবরণ করেন। কোরআন ও সহিহ হাদিসের শিক্ষা রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— “আল্লাহর সন্তুষ্টি পিতার সন্তুষ্টির মধ্যে এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টি পিতার অসন্তুষ্টির মধ্যে।” (জামে তিরমিজি) আরেক হাদিসে এসেছে— “মায়ের পদতলের নিচেই জান্নাত।” (সুনানে নাসাঈ) আজকের বাস্তবতায় এই শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্কেও পরিবর্তন এসেছে। ব্যস্ততা, কর্মজীবনের চাপ এবং ভোগবাদী মানসিকতার কারণে অনেক সন্তানই মা-বাবার যথাযথ খোঁজখবর নিতে পারেন না। অনেক বৃদ্ধ মা-বাবা নিঃসঙ্গ জীবন কাটান। কেউ কেউ অবহেলা, মানসিক কষ্ট কিংবা বৃদ্ধাশ্রমের বাস্তবতায় দিন পার করেন। অথচ ইসলামের শিক্ষা হলো—বৃদ্ধ বয়সে মা-বাবার পাশে থাকা, তাঁদের সম্মান করা এবং তাঁদের জন্য দোয়া করা। ইসলামে স্ত্রী, সন্তান ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যের অধিকার যেমন রয়েছে, তেমনি পিতা-মাতার অধিকারও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো—সবার হক ন্যায়সঙ্গতভাবে আদায় করা। জুমার দিনের অঙ্গীকার পবিত্র জুমার এই বরকতময় দিনে আসুন আমরা প্রত্যেকে নিজের হৃদয়কে প্রশ্ন করি— আমাদের মা-বাবা কি আমাদের আচরণে সন্তুষ্ট? যদি তাঁরা জীবিত থাকেন, তবে তাঁদের সময় দিই, খোঁজ নিই, সম্মান করি এবং অজান্তে কোনো কষ্ট দিয়ে থাকলে ক্ষমা চাই। আর যদি তাঁরা ইন্তেকাল করে থাকেন, তবে তাঁদের জন্য মাগফিরাতের দোয়া করি, সদকা করি এবং তাঁদের নামে নেক আমল করার চেষ্টা করি। কারণ একজন সন্তানের সবচেয়ে বড় সৌভাগ্য হলো—মা-বাবার দোয়া; আর সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য হলো—তাঁদের অসন্তুষ্টি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে পিতা-মাতার অধিকার যথাযথভাবে আদায় করার তাওফিক দান করুন, তাঁদের সন্তুষ্টির মাধ্যমে নিজের সন্তুষ্টি অর্জনের সৌভাগ্য নসিব করুন। আমিন। সাংবাদিক ও কলামিস্ট মমিনুল ইসলাম মুন Post navigation নামাজ: ইসলামের স্তম্ভ, আত্মশুদ্ধি, নৈতিকতা ও দুনিয়া-আখিরাতের সফলতার সর্বোত্তম পথ