জুমার দিনের মর্যাদা, নামাজ আদায়, সুরা কাহাফ তিলাওয়াত, দোয়া ও দরুদ পাঠে মুমিনের জন্য রয়েছে বিশেষ সওয়াবের আশা

দেশবার্তা বিডি২৪. কম, ধর্ম ডেস্ক :

ইসলামে সপ্তাহের দিনগুলোর মধ্যে জুমার দিন বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ। এ দিনকে কেন্দ্র করে মুসলিম উম্মাহর সাপ্তাহিক বৃহত্তম ইবাদত ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে জুমার দিনের গুরুত্ব, জুমার নামাজের বিধান এবং এ দিনের বিভিন্ন আমলের ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। তাই একজন মুমিনের উচিত যথাযথ পবিত্রতা অর্জন, সময়মতো মসজিদে উপস্থিতি, মনোযোগ দিয়ে খুতবা শ্রবণ এবং নামাজ আদায়ের পাশাপাশি দোয়া, জিকির ও দরুদ পাঠের মাধ্যমে দিনটি অতিবাহিত করা।

ইসলামি শিক্ষায় জুমার দিন শুধু আনুষ্ঠানিক ইবাদতের দিন নয়; বরং আত্মশুদ্ধি, আল্লাহর স্মরণ এবং পরকালীন কল্যাণ অর্জনেরও বিশেষ সুযোগ। এ দিনের মর্যাদা উপলব্ধি করে কোরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা অনুসরণ করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

জুমার দিনের বিশেষ মর্যাদা

হাদিস শরিফে জুমার দিনের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে বর্ণনা রয়েছে। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, সূর্য উদিত হয় এমন দিনগুলোর মধ্যে জুমার দিন সর্বোত্তম। এ দিনেই হজরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করা হয়েছে, জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়েছে এবং সেখান থেকে পৃথিবীতে অবতরণ করানো হয়েছে। আর কিয়ামতও জুমার দিনেই সংঘটিত হবে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮৫৪)

আরেকটি বর্ণনায় জুমার দিনকে দিনের নেতা এবং আল্লাহর কাছে মহান দিন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১০৮৪)

এসব হাদিস থেকে জুমার দিনের বিশেষ গুরুত্ব সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এ দিনকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো, নিয়মিত ইবাদতে মনোযোগী হওয়া এবং গুনাহ থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করা একজন মুমিনের দায়িত্ব।

জুমার দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমল নামাজ আদায়

জুমার দিনের প্রধান ইবাদত হলো জুমার নামাজ আদায় করা। পবিত্র কোরআনের সুরা জুমুআর নবম আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ, জুমার দিন যখন নামাজের জন্য আহ্বান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে ধাবিত হও এবং বেচাকেনা ছেড়ে দাও। এটাই তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা উপলব্ধি করো।’

এ আয়াতে জুমার নামাজের আহ্বান শোনার পর দুনিয়াবি কাজকর্ম স্থগিত রেখে আল্লাহর স্মরণে মনোযোগী হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাই জুমার নামাজের প্রস্তুতি হিসেবে আগে থেকেই কাজ গুছিয়ে রাখা, পরিচ্ছন্ন পোশাক পরা এবং নির্ধারিত সময়ের আগেই মসজিদে উপস্থিত হওয়ার চেষ্টা করা উচিত।

জুমার দিনের সুন্নত ও আদবের মধ্যে রয়েছে গোসল করা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা, সামর্থ্য অনুযায়ী উত্তম পোশাক পরিধান করা, সুগন্ধি ব্যবহার করা এবং মসজিদে গিয়ে মনোযোগসহকারে খুতবা শোনা। খুতবার সময় অনর্থক কথা বলা কিংবা অন্য কাজে ব্যস্ত থাকা থেকে বিরত থাকতে হবে।

সুনানে আবু দাউদের একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, যে ব্যক্তি জুমার দিন উত্তমভাবে গোসল করে, সকাল সকাল মসজিদে যায়, হেঁটে যায়, ইমামের কাছে বসে মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনে এবং অনর্থক কাজ থেকে বিরত থাকে, তার প্রতিটি পদক্ষেপের বিনিময়ে এক বছর নফল রোজা রাখা ও রাতের নফল নামাজ আদায়ের সওয়াবের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৪৫)

এ হাদিস জুমার নামাজের প্রস্তুতি, সময়ানুবর্তিতা এবং খুতবা মনোযোগ দিয়ে শোনার গুরুত্ব তুলে ধরে।

জুমার দিনে সুরা কাহাফ তিলাওয়াত

জুমার দিনের অন্যতম আলোচিত আমল হলো পবিত্র কোরআনের সুরা কাহাফ তিলাওয়াত করা। এ সুরায় ঈমানের দৃঢ়তা, আল্লাহর ওপর নির্ভরতা, জ্ঞান ও প্রজ্ঞা এবং দুনিয়ার জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে।

সুরা কাহাফ পাঠের ফজিলত সম্পর্কে হাদিসের বর্ণনায় এসেছে, যে ব্যক্তি জুমার দিনে এ সুরা পাঠ করবে, তার জন্য এক জুমা থেকে পরবর্তী জুমা পর্যন্ত নূর বা আলোর ব্যবস্থা করা হবে। (সুনানে বায়হাকি, হাদিস: ৬২০৯)

তাই জুমার দিনে সময় বের করে সুরা কাহাফ তিলাওয়াত করা যেতে পারে। শুধু তিলাওয়াতেই সীমাবদ্ধ না থেকে সুরাটির অর্থ ও শিক্ষা বোঝার চেষ্টা করাও গুরুত্বপূর্ণ। এতে কোরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী জীবন পরিচালনার অনুপ্রেরণা পাওয়া যায়।

দোয়া কবুলের বিশেষ সময় অনুসন্ধান

জুমার দিনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, এ দিনে এমন একটি সময় রয়েছে, যখন কোনো মুসলিম আল্লাহর কাছে কল্যাণকর কিছু প্রার্থনা করলে তা কবুল হওয়ার বিশেষ আশা করা যায়।

সুনানে আবু দাউদের একটি হাদিসে মহানবী (সা.) জুমার দিনে দোয়া কবুলের বিশেষ সময়ের কথা উল্লেখ করেছেন এবং দিনের শেষভাগে সেই সময় অনুসন্ধানের প্রতি গুরুত্ব দিয়েছেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১০৪৮)

অনেক আলেমের মতে, আসরের নামাজের পর থেকে সূর্যাস্তের আগপর্যন্ত সময়টি দোয়া কবুলের বিশেষ মুহূর্ত অনুসন্ধানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা, নিজের ও পরিবারের কল্যাণ, অসুস্থ ব্যক্তির সুস্থতা, ঋণমুক্তি, বিপদ থেকে রক্ষা এবং সমগ্র মুসলিম উম্মাহর শান্তি ও কল্যাণ কামনা করা যেতে পারে।

তবে দোয়া কবুলের নির্দিষ্ট মুহূর্ত সম্পর্কে আলেমদের মধ্যে একাধিক মত রয়েছে। তাই শুধু একটি সময়ের ওপর নির্ভর না করে জুমার দিনজুড়েই বেশি বেশি দোয়া ও ইবাদতে মনোযোগী হওয়া উত্তম।

বেশি বেশি দরুদ পাঠের গুরুত্ব

জুমার দিনের আরেকটি ফজিলতপূর্ণ আমল হলো মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা। দরুদ পাঠের মাধ্যমে মুসলমানরা নবীজির প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও আনুগত্য প্রকাশ করেন।

হাদিসে জুমার দিনে নবীজির ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করতে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে সুনানে বায়হাকিতে বর্ণনা রয়েছে যে, জুমার দিনে পাঠ করা দরুদ নবীজি (সা.)-এর কাছে পেশ করা হয়। (সুনানে বায়হাকি, ৩/২৪৯)

মুসলমানরা প্রচলিত সহিহ দরুদ, যেমন দরুদে ইবরাহিম, পাঠ করতে পারেন। নামাজের বাইরে সুযোগমতো দরুদ পাঠের পাশাপাশি নবীজির সুন্নাহ অনুসরণ, তাঁর আদর্শ অনুযায়ী জীবন পরিচালনা এবং মানুষের প্রতি সদাচরণ করার চেষ্টা করাও গুরুত্বপূর্ণ।

জুমার দিনের আমলে যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন

জুমার দিনের ইবাদতের পাশাপাশি দৈনন্দিন জীবনে নৈতিকতা ও দায়িত্বশীলতা বজায় রাখাও জরুরি। মিথ্যা বলা, পরনিন্দা, গিবত, প্রতারণা, অন্যের অধিকার নষ্ট করা এবং অযথা বিরোধে জড়িয়ে পড়া থেকে বিরত থাকা উচিত।

মসজিদে যাওয়ার সময় অন্য মুসল্লিদের কষ্ট না দেওয়া, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, কাতারে শৃঙ্খলা রক্ষা করা এবং খুতবার সময় নীরব থাকা জুমার দিনের আদবের অন্তর্ভুক্ত। একই সঙ্গে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা এবং প্রতিবেশীর অধিকার আদায়ের মতো কাজও ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

জুমার নামাজ আদায় করে আবার অন্যায় কাজে লিপ্ত হওয়া থেকে বিরত থাকার জন্য প্রত্যেকের আত্মসমালোচনা করা প্রয়োজন। ইবাদতের প্রকৃত শিক্ষা হলো আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের পাশাপাশি মানুষের সঙ্গে ন্যায়সংগত ও সুন্দর আচরণ করা।

ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির সুযোগ জুমার দিন

জুমার দিন মুসলমানদের জন্য সাপ্তাহিক ইবাদত, আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের এক বিশেষ সুযোগ। এ দিনের প্রধান আমল জুমার নামাজ যথাযথভাবে আদায় করা। এর পাশাপাশি সুরা কাহাফ তিলাওয়াত, বেশি বেশি দরুদ পাঠ, দোয়া ও জিকির এবং কোরআনের শিক্ষা অনুসরণ করার মাধ্যমে দিনটিকে অর্থবহ করে তোলা যায়।

তাই জুমার দিনের ফজিলত অর্জনে শুধু নির্দিষ্ট কিছু আমল পালন করাই নয়, বরং নিয়মিত ইবাদত, উত্তম চরিত্র, মানুষের অধিকার রক্ষা এবং পাপ থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করতে হবে। কোরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা মেনে চলার মধ্য দিয়েই একজন মুমিন তার জীবনে জুমার দিনের শিক্ষা বাস্তবায়ন করতে পারেন

By moon24

মমিনুল ইসলাম মুন। সম্পাদক ও প্রকাশক। দেশবার্তা বিডি ২৪. কম। 📲 01740 93 58 70 বার্তাকক্ষ-01722 320196 Email : mominulinqilab@gmail.com deshbartabd86@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *