কিশোরী তাজমিন হত্যার ঘটনায় ভুক্তভোগীকে দোষারোপের বিরুদ্ধে অ্যাডভোকেট মায়া আক্তারের প্রতিবাদ ;

‘পোশাক বা রাতে বাইরে থাকা নয়, অপরাধীর বিচারই হোক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু’

👨‍💼 মমিনুল ইসলাম মুন নিজস্ব প্রতিবেদক,রাজশাহী :

কিশোরী তাজমিনের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুক্তভোগী ও তাঁর পরিবারকে দোষারোপ করার প্রবণতার বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ জানিয়েছেন অ্যাডভোকেট মায়া আক্তার। তাঁর মতে, কোনো নারী বা কিশোরী কখন, কোথায় এবং কী পোশাক পরে চলাফেরা করেছেন, সেই প্রশ্ন তুলে হত্যাকাণ্ডের দায় ভুক্তভোগীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বরং এ ধরনের অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত, গ্রেপ্তার এবং আইনের আওতায় এনে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবিতে সোচ্চার হওয়া প্রয়োজন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক প্রতিবাদী বক্তব্যে অ্যাডভোকেট মায়া আক্তার ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করার মানসিকতার সমালোচনা করেন। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর হলো—একজন নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কোনো অপরাধের শিকার ব্যক্তির চলাফেরা, পোশাক কিংবা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে তাঁকে অপরাধের জন্য দায়ী করা হলে প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের দাবি আড়ালে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

‘ভুক্তভোগীকে নয়, অপরাধীদের বিচারের দাবি তুলুন’

কিশোরী তাজমিনের মৃত্যুর ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের মন্তব্য ছড়িয়ে পড়েছে। এসব মন্তব্যের কিছুতে মেয়েটির রাতে বাড়ির বাইরে থাকা, কোথায় গিয়েছিল কিংবা কী পোশাক পরেছিল—এসব বিষয়কে সামনে এনে তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে দায়ী করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে প্রতিবাদকারীরা অভিযোগ করছেন।

এ ধরনের মানসিকতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে অ্যাডভোকেট মায়া আক্তার মনে করেন, হত্যাকাণ্ডের মতো গুরুতর অপরাধের পর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত অপরাধীদের শনাক্ত করা, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা। ভুক্তভোগীর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করে অপরাধের গুরুত্ব কমিয়ে দেখা কিংবা হত্যাকারীদের দায় আড়াল করা উচিত নয়।

একজন কিশোরী, প্রাপ্তবয়স্ক নারী কিংবা পুরুষ—যে কেউ জরুরি প্রয়োজনে রাতের বেলায় বাড়ির বাইরে যেতে পারেন। অসুস্থ স্বজনের জন্য ওষুধ সংগ্রহ, হাসপাতালে যাওয়া কিংবা অন্য কোনো প্রয়োজনেও মানুষকে চলাচল করতে হতে পারে। এ অবস্থায় নাগরিকেরা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে আস্থাহীনতায় ভুগলে তা সমাজ ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে।

পোশাক নয়, অপরাধের দায় অপরাধীর

কিশোরী তাজমিনের পোশাক নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন তোলার বিষয়টিও সমালোচনার মুখে পড়েছে। প্রতিবাদকারীদের মতে, পোশাক কখনোই কোনো ব্যক্তির ওপর সহিংসতা চালানো বা তাঁকে হত্যা করার বৈধতা দিতে পারে না। কেউ জিন্স-টপস পরুন কিংবা বোরকা—কোনো পোশাকই তাঁকে অপরাধের শিকার হওয়ার জন্য দায়ী করে না।

অ্যাডভোকেট মায়া আক্তারের প্রতিবাদের তাৎপর্যও এখানেই—অপরাধের শিকার ব্যক্তির আচরণ বা পোশাক নিয়ে বিতর্ক তৈরি না করে অপরাধের প্রকৃতি, অপরাধীদের পরিচয় এবং বিচারপ্রক্রিয়ার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। ভুক্তভোগীকে দোষারোপের সংস্কৃতি অপরাধের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধকে দুর্বল করতে পারে এবং ভবিষ্যতে নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার চাওয়ার ক্ষেত্রেও বাধা সৃষ্টি করতে পারে।

নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব

একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রে নাগরিকের নিরাপদে চলাফেরা, ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং মর্যাদা রক্ষার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নারী, শিশু-কিশোরী কিংবা পুরুষ—সবার জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বের অংশ।

কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে তার দায় নির্ধারণ করতে হবে তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতে। ভুক্তভোগী কোথায় গিয়েছিলেন, কেন রাতে বাইরে ছিলেন কিংবা পরিবারের অনুমতি ছিল কি না—এসব প্রশ্ন কোনোভাবেই হত্যাকাণ্ডের দায় অপরাধীদের কাছ থেকে সরিয়ে দিতে পারে না।

তাজমিনের মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং অপরাধের প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে নতুন করে ভাবনার অবকাশ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে অনলাইনে মন্তব্য করার ক্ষেত্রে সংবেদনশীলতা, মানবিকতা এবং ভুক্তভোগী ও তাঁর পরিবারের মর্যাদা রক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন।

‘ভিকটিম ব্লেমিং বন্ধ হোক, ন্যায়বিচারের দাবি জোরালো হোক’

অ্যাডভোকেট মায়া আক্তারের প্রতিবাদে যে বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে, তা হলো—কোনো অপরাধের শিকার ব্যক্তিকে দোষারোপ না করে অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনার জন্য সামাজিকভাবে সোচ্চার হওয়া। হত্যাকাণ্ডের মতো গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে আবেগনির্ভর বা অনুমানভিত্তিক মন্তব্যের পরিবর্তে নিরপেক্ষ তদন্ত, নির্ভরযোগ্য তথ্য এবং আইনের শাসনের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।

কিশোরী তাজমিনের মৃত্যুর ঘটনায় প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটন, জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার এবং আইনানুগ বিচার নিশ্চিত করার দাবি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুক্তভোগীকে হেয় করা, তাঁর পরিবারকে দোষারোপ করা কিংবা অপরাধকে ন্যায্যতা দেওয়ার মতো মন্তব্যের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলাও জরুরি।

একটি সভ্য সমাজে অপরাধের দায় অপরাধীর, ভুক্তভোগীর নয়। তাই তাজমিনের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় ভিকটিম ব্লেমিং বন্ধ করে সত্য উদ্‌ঘাটন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হোক।

#StopVictimBlaming

 

 

 

By moon24

মমিনুল ইসলাম মুন। সম্পাদক ও প্রকাশক।Facebook : Journalist Moon Tanore দেশবার্তা বিডি ২৪. কম। 📲 01740 93 58 70 বার্তাকক্ষ-01722 320196 Email : mominulinqilab@gmail.com deshbartabd86@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *