প্রবল সক্রিয় মৌসুমি বায়ু, দেশজুড়ে টানা ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস; পাহাড়ধস ও জলাবদ্ধতার শঙ্কা, সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর সতর্কসংকেত

বিশেষ প্রতিবেদক, ঢাকা:

উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় গভীর সঞ্চারণশীল মেঘমালা সৃষ্টি এবং মৌসুমি বায়ু প্রবলভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শুরু হয়েছে টানা বৃষ্টিপাত। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অধিকাংশ এলাকায় আগামী কয়েক দিন বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে। কোথাও কোথাও মাঝারি থেকে অতি ভারী বর্ষণের সম্ভাবনাও রয়েছে। এতে নগরাঞ্চলে জলাবদ্ধতা, সড়কে যান চলাচলে বিঘ্ন এবং পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে আগামী তিন দিন দেশের অধিকাংশ এলাকায় বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। একই সঙ্গে কোথাও কোথাও দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি ও বজ্রবৃষ্টি হতে পারে। টানা বৃষ্টির কারণে জনজীবনে স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি নিম্নাঞ্চলে পানি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল, খুলনা ও ময়মনসিংহ বিভাগের অধিকাংশ জায়গায় এবং রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের অনেক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি কিংবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাঝারি ধরনের ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণও হতে পারে। ফলে ইতোমধ্যে যেসব এলাকায় পানি জমে আছে, সেখানে পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। নগরাঞ্চলের অপর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং নিচু সড়ক ও আবাসিক এলাকায় বৃষ্টির পানি জমে সাময়িক দুর্ভোগ তৈরি হতে পারে।

বৃষ্টির সঙ্গে দেশের বিভিন্ন এলাকায় দমকা ও ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। কোথাও কোথাও বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ৪৫ থেকে ৬০ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে খোলা জায়গায় থাকা মানুষ, দুর্বল স্থাপনা, বিদ্যুতের খুঁটি, সাইনবোর্ড ও গাছপালার ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন।

বিশেষ করে ঝড়ো হাওয়ার সময় নদী, খোলা মাঠ কিংবা উপকূলীয় এলাকায় অবস্থান না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বজ্রপাতের সময় নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বৈরী আবহাওয়ার কারণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। উত্তর বঙ্গোপসাগর ও বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় ঝড়ো হাওয়া বয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় এ সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ নদীবন্দরগুলোর জন্য ১ নম্বর নৌ-সতর্কসংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার ট্রলার ও নৌকাগুলোকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি থেকে সাবধানে চলাচল করতে বলা হয়েছে।

সমুদ্র উত্তাল থাকলে ছোট নৌযান ও মাছ ধরার ট্রলার দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট সবাইকে আবহাওয়া পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

টানা বৃষ্টিতে রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন নিচু এলাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের প্রধান শহরসহ দেশের অন্যান্য নগরাঞ্চলেও জলাবদ্ধতা দেখা দিতে পারে। এতে অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ পথচারীদের দুর্ভোগ বাড়তে পারে।

বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, অলিগলি ও নিচু এলাকার রাস্তায় পানি জমে যানবাহন চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশন না হলে কোথাও কোথাও দীর্ঘ সময় ধরে জলাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে।

অতিবৃষ্টির কারণে শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলের নিচু জমি, ফসলি মাঠ ও বসতবাড়িতেও পানি প্রবেশের আশঙ্কা রয়েছে। এতে কৃষিকাজ ও স্থানীয় যোগাযোগব্যবস্থায়ও প্রভাব পড়তে পারে।

একটানা ভারী বৃষ্টির কারণে চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের পাহাড়ি এলাকাগুলোতে ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়তে পারে। পাহাড়ের পাদদেশে ও ঢালে বসবাসকারী মানুষদের বিশেষভাবে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে ভারী বৃষ্টিপাত হলে পাহাড়ের মাটি অতিরিক্ত পানি শোষণ করে দুর্বল হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় পাহাড়ের ঢাল ধসে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। তাই ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার প্রস্তুতি রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একটানা বৃষ্টিপাত এবং উজান থেকে নেমে আসা পানির কারণে প্রধান প্রধান নদ-নদীর পানি সমতল বৃদ্ধি পেতে পারে। এতে নদীতীরবর্তী ও নিম্নাঞ্চলে পানি প্রবেশের আশঙ্কা রয়েছে।

ইতোমধ্যে যেসব এলাকায় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে, সেখানে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে। নদীর পানি দ্রুত বাড়লে স্থানীয়ভাবে বন্যার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। ফলে নদীতীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের পানি বৃদ্ধির বিষয়ে সতর্ক থাকার প্রয়োজন রয়েছে।

বৃষ্টিপাতের কারণে সারাদেশে দিন ও রাতের তাপমাত্রা ২ থেকে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কমে যেতে পারে। ফলে আবহাওয়ায় শীতল অনুভূতি তৈরি হতে পারে এবং দিনের স্বাভাবিক তাপমাত্রা কিছুটা কম থাকবে।

তবে বৃষ্টির বিরতিতে কোথাও কোথাও ভ্যাপসা আবহাওয়া বিরাজ করতে পারে। বজ্রসহ বৃষ্টির সময় বিদ্যুৎ চমকানো ও দমকা হাওয়ার কারণে জনসাধারণকে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

আবহাওয়া পরিস্থিতির অবনতি হলে সাধারণ মানুষকে অপ্রয়োজনে ঘর থেকে বের না হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বাইরে থাকলে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়া, ঝড়ের সময় গাছ বা বৈদ্যুতিক খুঁটির নিচে অবস্থান না করা এবং বজ্রপাতের সময় খোলা জায়গা এড়িয়ে চলার পরামর্শ রয়েছে।

এদিকে নৌযান ও মাছ ধরার ট্রলারগুলোকেও সতর্কতার সঙ্গে চলাচল করতে বলা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে সম্ভাব্য জলাবদ্ধতা, পাহাড়ধস ও বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, মৌসুমি বায়ুর সক্রিয়তার কারণে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা আরও কিছুদিন থাকতে পারে। ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষকে আবহাওয়ার সর্বশেষ পূর্বাভাস ও সতর্কবার্তা অনুসরণ করে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

By চাঁদ২৪

মমিনুল ইসলাম মুন। সম্পাদক ও প্রকাশক। দেশবার্তা বিডি ২৪. কম। 📲 01740 93 58 70 বার্তাকক্ষ-01722 320196 Email : mominulinqilab@gmail.com deshbartabd86@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *