বাদী চেনেন না, এজাহারেও নাম নেই—তবু প্রবাসী সিরাজুল গ্রেপ্তার!
তানোরে ২০২৪ সালের মামলা নিয়ে প্রশ্ন

মন্তব্য প্রতিবেদন | মমিনুল ইসলাম মুন
রাজশাহীর তানোরে ২০২৪ সালের একটি মামলায় প্রবাসী মো. সিরাজুল ইসলামকে (৪৭) গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানোর ঘটনায় নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। পুলিশের আদালতে দাখিল করা প্রতিবেদনে তাঁকে ২ নম্বর বাধাইড় ইউনিয়ন প্রজন্মলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে চাঁদা দাবি, মারধর ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগও আনা হয়েছে। তবে মামলার বাদী নিজেই বলছেন, তিনি এ বিষয়ে কিছুই জানেন না, আসামি সিরাজুল ইসলামকেও চেনেন না। বরং সাংবাদিকের কাছ থেকেই তিনি প্রথম বিষয়টি শুনেছেন বলে জানিয়েছেন। ফলে মামলার অভিযোগ, আসামির পরিচয় এবং তদন্তের ভিত্তি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
পুলিশের আদালতে পাঠানো প্রতিবেদন অনুযায়ী, তানোর থানার মামলা নম্বর ০১, তারিখ ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪ এবং জিআর মামলা নম্বর ২২১/২৪। দণ্ডবিধির ১৪৩/৩২৩/৩০৭/৩৬৫/৩৮৬/৩৭৯/৫০৬/১১৪/৩৪ ধারায় মামলাটি করা হয়েছে। প্রতিবেদনে কথিত ঘটনার তারিখ ৪ আগস্ট ২০২৪ উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই দিন বেলা ১১টার দিকে তানোর পৌরসভার আমশো মেডিকেল মোড়ে মিজানুর রহমানের দোকানের সামনে ভয়ভীতি দেখিয়ে তিন লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ রয়েছে। পরে তাঁকে গোল্লাপাড়া বাজার এলাকার আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়ে নিয়ে মারধর ও পুনরায় চাঁদা দাবির অভিযোগ করা হয়েছে। পুলিশের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, তদন্তে সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে এবং তাঁকে জেলহাজতে আটক রাখার আবেদন করা হয়েছে।
বাদীর বক্তব্যেই নতুন প্রশ্ন
এ মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত বিষয় হলো বাদীর নিজের বক্তব্য। সাংবাদিকের সঙ্গে কথোপকথনে বাদী বলেছেন, “আমি এ বিষয়ে কিছুই জানি না। আসলে আমি তাঁকে চিনি না। এখন আপনার মুখে শুনেছি।”
বাদীর এমন বক্তব্যের পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—যাঁর বিরুদ্ধে মামলা, তাঁকে বাদী যদি চিনেই না থাকেন এবং এ বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে দাবি করেন, তাহলে কীভাবে ওই ব্যক্তি মামলার আসামি হলেন?
মূল এজাহারে সিরাজুল ইসলামের নাম উল্লেখ ছিল কি না, পরবর্তী সময়ে তদন্তের কোন পর্যায়ে তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং কার বক্তব্য বা কী ধরনের তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তাঁকে অভিযুক্ত করা হয়েছে, তা পরিষ্কার হওয়া জরুরি।
বাদীর বক্তব্যের সঙ্গে পুলিশের আদালতে দাখিল করা প্রতিবেদনের বিষয়বস্তু মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। বাদীর বক্তব্য, মূল এজাহার, সাক্ষীদের জবানবন্দি এবং তদন্তের নথি নিরপেক্ষভাবে যাচাই করলেই প্রকৃত বিষয়টি সামনে আসতে পারে।
কারণ, একজন নাগরিককে মামলায় আসামি করার ক্ষেত্রে অভিযোগের সঙ্গে তাঁর সংশ্লিষ্টতার পক্ষে গ্রহণযোগ্য তথ্য-প্রমাণ থাকা প্রয়োজন। বাদীর বক্তব্যের সত্যতা ও প্রেক্ষাপটও যথাযথভাবে যাচাই করা জরুরি।
বাড়ি থেকে কথিত ঘটনাস্থল প্রায় ১৫ কিলোমিটার
স্থানীয়দের দাবি, সিরাজুল ইসলামের বাড়ি তানোরের জুমারপাড়া গ্রামে। অন্যদিকে, পুলিশের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা কথিত ঘটনাস্থল আমশো মেডিকেল মোড় ও গোল্লাপাড়া বাজার এলাকা। স্থানীয়দের হিসাব অনুযায়ী, তাঁর বাড়ি থেকে ঘটনাস্থলের দূরত্ব প্রায় ১৫ কিলোমিটার।
অবশ্য দূরত্ব বেশি হলেই কেউ ঘটনাস্থলে যেতে পারেননি, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। তবে ঘটনার দিন তাঁর অবস্থান, যাতায়াত, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য, সিসিটিভি ফুটেজ কিংবা অন্যান্য তথ্য-প্রমাণ তদন্তে কতটা গুরুত্ব পেয়েছে, তা পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
প্রজন্মলীগের সাধারণ সম্পাদক—পরিচয়ের ভিত্তি কী?
পুলিশের আদালতে দাখিল করা প্রতিবেদনে সিরাজুল ইসলামকে ২ নম্বর বাধাইড় ইউনিয়ন প্রজন্মলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, তাঁর পরিবার ও স্থানীয়দের দাবি, তিনি দীর্ঘদিন প্রবাসে ছিলেন এবং পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে ছুটিতে দেশে এসেছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়েও তাঁরা প্রশ্ন তুলেছেন।
তাহলে তাঁকে ওই সাংগঠনিক পদে উল্লেখ করার ভিত্তি কী? সংশ্লিষ্ট কমিটির তালিকা, সাংগঠনিক নথি, ছবি, ভিডিও কিংবা অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য কি পুলিশের কাছে রয়েছে? থাকলে তা যাচাই করে পরিষ্কার করা প্রয়োজন।
একজন নাগরিকের রাজনৈতিক পরিচয় নির্ধারণে অনুমান নয়, তথ্য-প্রমাণই হওয়া উচিত প্রধান ভিত্তি। রাজনৈতিক পরিচয় ভুলভাবে উল্লেখ করা হয়ে থাকলে সেটিও সংশোধন ও জবাবদিহির বিষয়।
আইনের প্রয়োগ কি সবার জন্য সমান?
স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, অতীতে রাজনৈতিক প্রভাব ও বিভিন্ন পদ-পদবি ব্যবহার করে সুবিধা নেওয়া এবং দুর্নীতি, নিয়োগ-বাণিজ্যসহ নানা অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে—এমন কিছু ব্যক্তি এখনো প্রকাশ্যে চলাফেরা করছেন। অথচ একজন প্রবাসীকে প্রায় দুই বছর আগের মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
স্থানীয়দের আরেকটি অংশের প্রশ্ন, কোনো রাজনৈতিক নেতা কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তির চাপ বা ইচ্ছার কারণে সিরাজুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে কি না। তবে এ অভিযোগের স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য সত্যতা এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং পুলিশের ব্যাখ্যা পাওয়া জরুরি।
আইনের শাসনের মূল কথা হলো, অভিযোগ যার বিরুদ্ধেই থাকুক, তদন্ত হতে হবে নিরপেক্ষ এবং আইন প্রয়োগ হতে হবে সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে। কাউকে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে হয়রানি করা যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা প্রভাবের কারণে কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে রাখাও সমর্থনযোগ্য নয়।
সংবাদ প্রকাশ ঘিরে সাংবাদিক মমিনুল মুনের নিরাপত্তা শঙ্কা
এ ঘটনা নিয়ে সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশের প্রস্তুতির মধ্যে সাংবাদিক মমিনুল ইসলাম মুনের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাঁর দাবি, গোপন সূত্রে তাঁকে গ্রেপ্তারের হুমকি দেওয়ার একটি তথ্য তাঁর কাছে পৌঁছেছে। তবে তানোর থানার ওসি মাহমুদুল হাসান সরাসরি তাঁকে এমন কোনো হুমকি দিয়েছেন—এমন অভিযোগ তিনি করেননি। ওসির কাছ থেকেও তিনি সরাসরি এ ধরনের কোনো কথা শোনেননি।
বিষয়টি জানার পর নিজের নিরাপত্তার স্বার্থে রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি, রাজশাহীর পুলিশ সুপার, তানোর থানার ওসি এবং তানোর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে আগাম অবহিত করেছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
সাংবাদিক মমিনুল ইসলাম মুনের আশঙ্কা, বর্তমান পরিস্থিতিতে তানোরে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি চাপ, হয়রানি কিংবা নিরাপত্তাঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন। এ কারণে তাঁকে তানোর থেকে প্রত্যাহার করে অন্যত্র দায়িত্ব পালনের ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
একজন সাংবাদিকের দায়িত্ব জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট তথ্য সংগ্রহ, যাচাই ও প্রকাশ করা। কোনো সংবাদে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য নেওয়া এবং তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ প্রতিবেদন প্রকাশ করাই সাংবাদিকতার নীতি। এ দায়িত্ব পালনের কারণে কোনো সাংবাদিক নিরাপত্তাহীনতায় ভুগলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার এজাহার, তদন্তের অগ্রগতি, গ্রেপ্তারের কারণ এবং আদালতে দাখিল করা পুলিশের প্রতিবেদন নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। বিশেষ করে বাদীর বক্তব্য, এজাহারে আসামির নাম থাকা-না থাকা এবং পরবর্তী সময়ে কীভাবে তাঁকে মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, তার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
এ ছাড়া তাঁকে প্রজন্মলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে উল্লেখ করার ভিত্তি, কথিত ঘটনার দিন তাঁর অবস্থান এবং তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের পক্ষে থাকা সাক্ষ্য-প্রমাণ যাচাই করতে হবে।
কোনো রাজনৈতিক নেতা বা প্রভাবশালীর চাপ কিংবা ব্যক্তিগত বিরোধের কারণে তাঁকে হয়রানি করা হয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন। পাশাপাশি সাংবাদিক মমিনুল ইসলাম মুনের নিরাপত্তা শঙ্কা ও তানোর থেকে প্রত্যাহারের আবেদন বিবেচনা করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশের মহাপরিদর্শক, রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি এবং রাজশাহীর পুলিশ সুপারের কাছে প্রত্যাশা, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করে নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা হবে।
আমরা কোনো অপরাধীকে আড়াল করতে চাই না, আবার কোনো নিরপরাধ মানুষকে হয়রানির শিকার হতেও দেখতে চাই না। সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী বিচার হোক। আর তদন্তে ক্ষমতার অপব্যবহার, ভুল রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা হয়রানির প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা হোক।
একই সঙ্গে একজন গণমাধ্যমকর্মীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। সংবাদ প্রকাশের কারণে কোনো সাংবাদিককে ভয়ভীতি কিংবা নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পড়তে হলে তা শুধু একজন সাংবাদিকের সমস্যা নয়, স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশের জন্যও উদ্বেগজনক।
শেষ প্রশ্ন—মামলার বাদী যদি নিজেই বলেন, তিনি আসামিকে চেনেন না, এ বিষয়ে কিছুই জানেন না এবং সাংবাদিকের কাছ থেকেই প্রথম বিষয়টি শুনেছেন, তাহলে সিরাজুল ইসলাম কীসের ভিত্তিতে এ মামলার আসামি হলেন? এই প্রশ্নের স্বচ্ছ, তথ্যভিত্তিক ও আইনসম্মত জবাব কি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দেবে?
ন্যায়বিচার নিশ্চিত হোক, নিরপেক্ষ তদন্ত হোক, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হোক এবং নিরাপদ থাকুক সাংবাদিকতা।
— মমিনুল ইসলাম মুন
গণমাধ্যমকর্মী
সম্পাদক ও প্রকাশক মমিনুল ইসলাম মুন।
মোবাইল ০১৭৪০৯৩৫৮৭০