তেল সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত, দেশজুড়ে ভয়াবহ লোডশেডিং;||
তেলভিত্তিক ৫৩ বিদ্যুৎকেন্দ্রে মজুত তলানিতে, এক-চতুর্থাংশে নেমেছে উৎপাদন
দেশবার্তা বিডি২৪. কম, নিউজ ডেস্ক :
দেশের বিদ্যুৎ খাতে নতুন করে গভীর সংকট তৈরি হয়েছে। তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলের মজুত আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এর প্রভাব পড়েছে সারাদেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায়। রাজধানী থেকে শুরু করে বিভাগীয় শহর, জেলা ও উপজেলা—প্রায় সর্বত্র দীর্ঘ সময়ের লোডশেডিংয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমানে দেশের ৫৩টি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অধিকাংশেই প্রয়োজনীয় জ্বালানি নেই। অনেক কেন্দ্রে মাত্র এক-দুই দিনের তেল অবশিষ্ট রয়েছে, আবার কয়েকটি কেন্দ্র পুরোপুরি তেলশূন্য হয়ে অলস পড়ে আছে। ফলে প্রায় ৫ হাজার ৪৬২ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতার এসব কেন্দ্র থেকে বাস্তবে উৎপাদন নেমে এসেছে মাত্র প্রায় ১ হাজার ৭০০ মেগাওয়াটে, যা মোট সক্ষমতার এক-চতুর্থাংশেরও কম।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সূত্রে জানা গেছে, স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে প্রতিটি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে অন্তত ১৫ দিনের জ্বালানি মজুত থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে গড়ে ৭ থেকে ৮ দিনের বেশি তেল নেই। অনেক কেন্দ্রে সেই মজুতও শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। ফলে দিনের অধিকাংশ সময় কেন্দ্রগুলো বন্ধ রেখে কেবল সন্ধ্যার পিক আওয়ারে সীমিত পরিসরে চালানো হচ্ছে।
গ্যাস সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তেল সংকট
বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ থাকায় দেশে গ্যাস সরবরাহ আগেই কমে গেছে। গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পাওয়ায় উৎপাদন কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। এর মধ্যেই তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে জ্বালানির মজুত তলানিতে নেমে আসায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে দ্বৈত সংকট সৃষ্টি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দুই সংকট একসঙ্গে চলতে থাকলে সামনের দিনগুলোতে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে উঠতে পারে।
বকেয়া ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি, তেল কিনতে পারছে না আইপিপি
বিদ্যুৎ খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে উঠে এসেছে বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর (আইপিপি) বিপুল পরিমাণ বকেয়া বিল। সংশ্লিষ্টদের দাবি, বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে পিডিবির বকেয়া পাওনার পরিমাণ ৪০ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
দীর্ঘদিন অর্থ পরিশোধ না হওয়ায় অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান নতুন করে ফার্নেস অয়েল বা ডিজেল কিনতে পারছে না। ফলে উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও জ্বালানির অভাবে কেন্দ্রগুলো বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
একজন জ্যেষ্ঠ বিদ্যুৎ কর্মকর্তা জানান, দেশে বর্তমানে বিদ্যুতের চাহিদা ১৭ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু জ্বালানি সংকটের কারণে সেই সক্ষমতার বড় অংশ ব্যবহার করা যাচ্ছে না। অনেক সময় ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
‘টাকা না পেলে তেল কিনব কীভাবে’
বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশনের (বিপ্পা) নেতারা বলছেন, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ৬ থেকে ৭ মাসের বিল বকেয়া রয়েছে। সরকারের কাছে একাধিকবার বিষয়টি তুলে ধরা হলেও কার্যকর সমাধান হয়নি।
তাদের ভাষ্য, বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নিয়মিত তেল কিনতে বিপুল অর্থ প্রয়োজন। বকেয়া বিল না পেলে সেই ব্যয় বহন করা সম্ভব নয়। ফলে উৎপাদন কমানো ছাড়া বিকল্প নেই।
ক্যাপাসিটি চার্জ দিচ্ছে সরকার, বিদ্যুৎ পাচ্ছে না মানুষ
বিদ্যুৎ খাতে আরেকটি বড় বিতর্ক ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়ে। প্রতিবছর সরকার বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রকে প্রায় ৪৮ হাজার কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করে। এর মধ্যে তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর অংশ প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা।
বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন, বিপুল অর্থ ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে পরিশোধের পরও যদি উৎপাদন না বাড়ে এবং মানুষ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না পায়, তাহলে এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে।
অনেক কেন্দ্রে নেই একদিন চলার মতো তেলও
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশের বহু তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে একদিন চালানোর মতো জ্বালানিও অবশিষ্ট নেই। কয়েকটি কেন্দ্র পুরোপুরি তেলশূন্য হয়ে উৎপাদন বন্ধ রেখেছে।
বিশেষ করে গাজীপুর, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, ফেনী, চাঁদপুর, খুলনা, নাটোরসহ বিভিন্ন এলাকার একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। ফলে ওইসব অঞ্চলে লোডশেডিং তুলনামূলক বেশি হচ্ছে।
অন্যদিকে হাতে গোনা কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে ১০ থেকে ১৮ দিনের মতো তেল মজুত রয়েছে। তবে দেশের মোট তেলভিত্তিক কেন্দ্রের তুলনায় এ সংখ্যা খুবই কম।
বৃষ্টি কমিয়েছে চাহিদা, সংকট কাটেনি
সাম্প্রতিক কয়েক দিনের বৃষ্টিপাতের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা কিছুটা কমেছে। ফলে লোডশেডিংও সাময়িকভাবে কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি স্থায়ী সমাধান নয়। উৎপাদন বাড়েনি; বরং চাহিদা কম থাকায় পরিস্থিতি সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এক পর্যায়ে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল প্রায় ১৫ হাজার ৫৩৯ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে মাত্র ১৩ হাজার ২৫৫ মেগাওয়াট। ফলে প্রায় ২ হাজার ২৮৪ মেগাওয়াটের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
শিল্প, ব্যবসা ও জনজীবনে বাড়ছে ভোগান্তি
ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে শিল্প-কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা জেনারেটরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে অতিরিক্ত ব্যয় বহন করছেন। কৃষি সেচ, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বিশেষ করে সন্ধ্যার পর দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় শহর ও গ্রামাঞ্চলে চরম ভোগান্তির সৃষ্টি হয়েছে। অনেক এলাকায় দিনে একাধিকবার বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকায় জনমনে ক্ষোভ বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মত
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল অস্থায়ীভাবে তেল সরবরাহ বাড়িয়ে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না। বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বকেয়া দ্রুত পরিশোধ, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করা এবং বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় সামনের মাসগুলোতে বিদ্যুৎ সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।।
সম্পাদক ও প্রকাশক মমিনুল ইসলাম মুন।
মোবাইল ০১৭৪০৯৩৫৮৭০