তানোরে সরকারি ধান সংগ্রহে , ৩০–৪০ লাখ টাকার অনিয়মের অভিযোগ: ভূয়া কৃষকের নামে বিল, তদন্তের দাবি
বিশেষ প্রতিনিধি :
রাজশাহীর তানোর উপজেলায় চলতি বোরো-২০২৬ মৌসুমে সরকারি ধান সংগ্রহ কার্যক্রমে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি বরাদ্দের ধান সংগ্রহ ও চাল সরবরাহ প্রক্রিয়ায় একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট ভূয়া কৃষকের নামে অনলাইন বিল তৈরি করে এবং নিম্নমানের চাল সরবরাহ দেখিয়ে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছে। বিষয়টি নিয়ে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, চলতি বোরো-২০২৬ মৌসুমে তানোর উপজেলার জন্য মোট ১ হাজার ৬৫০ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহের বরাদ্দ আসে। এর মধ্যে কামারগাঁ খাদ্য গুদামের জন্য ৫৫৫ মেট্রিক টন ধান বরাদ্দ দেওয়া হয়, যা কামারগাঁ ও কলমা ইউনিয়নের তালিকাভুক্ত কৃষকদের কাছ থেকে সংগ্রহ করার কথা ছিল।
অভিযোগ অনুযায়ী, কামারগাঁ খাদ্য গুদামে ধারণক্ষমতার সংকট থাকায় প্রথমে ৩৬০ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহ করা হয়। এরপর অতিরিক্ত ধান ছাঁটাইয়ের জন্য রাজশাহী জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে আবেদন পাঠানো হয়। কিন্তু প্রশাসনিক জটিলতায় সেই প্রক্রিয়া বিলম্বিত হলে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে তানোর খাদ্য গুদামে আরও প্রায় ২০০ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেন।
এ সুযোগকে কেন্দ্র করে তানোর খাদ্য গুদামে কর্মরত সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগকারীদের দাবি, কামারগাঁর প্রায় ২০০ মেট্রিক টন এবং তানোর খাদ্য গুদামের প্রায় ৬০০ মেট্রিক টনসহ মোট ৮০০ মেট্রিক টন ধান একটি অটোমিলের নামে ছাঁটাইয়ের বরাদ্দ আনা হয়। কিন্তু বাস্তবে গুদাম থেকে বরাদ্দ অনুযায়ী ধান সরবরাহ না করে বিভিন্ন কৃষকের নামে অনলাইনে ধান সরবরাহ দেখিয়ে বিল সম্পন্ন করা হয়।
অভিযোগে আরও বলা হয়, পরে ওই বরাদ্দের বিপরীতে বাজার থেকে নিম্নমানের চাল কিনে সরকারি গুদামে সরবরাহ দেখানো হয়। এতে কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি সিন্ডিকেট প্রায় ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা অনিয়মের মাধ্যমে আত্মসাৎ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, এফএম অটোমিলের নামে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় থেকে যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, সেই বরাদ্দের বিপরীতে যেসব কৃষকের নামে অনলাইন বিল করা হয়েছে, তাদের বাড়িতে গিয়ে তদন্ত করলেই প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে। অনেক কৃষকই দাবি করতে পারেন যে তারা কখনো সরকারি গুদামে ধান বিক্রি করেননি। এমনকি তাদের নামে যে কৃষি ব্যাংকের হিসাব ব্যবহার করা হয়েছে, সে সম্পর্কেও তারা অবগত নন বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
এ ঘটনায় জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও অনিয়মে সহযোগিতার অভিযোগ তোলা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, ধান ছাঁটাই ও সরবরাহ কার্যক্রম যথাযথভাবে তদারকির দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্টরা তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেননি। এমনকি আর্থিক সুবিধা গ্রহণের অভিযোগও আনা হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে অডিটর মশিউর রহমানের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে ফোনটি একজন নারী রিসিভ করেন। সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার পর তিনি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরে আর তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
কারিগরি পরিদর্শক শফিউর রহমানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি সংক্ষিপ্তভাবে বলেন, "আমি বাইরে আছি, পরে কথা বলব।" এরপর আর তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে তানোর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক, তানোর ও কামারগাঁ খাদ্য গুদামের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাদের বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এলাকার সচেতন মহল বলছে, অভিযোগগুলো অত্যন্ত গুরুতর। তাই বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। একই সঙ্গে সরকারি ধান সংগ্রহ কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দাবিও জানিয়েছেন তারা।
সম্পাদক ও প্রকাশক মমিনুল ইসলাম মুন।
মোবাইল ০১৭৪০৯৩৫৮৭০