তানোরে শ্লীলতাহানির মুল্য ৩ লাখ ১০ হাজার, মাফ ২০,আদায় ২ লাখ ৯০ হাজার, বোর্ড খরচ দেড় লাখ !
ক্রাইম রিপোর্টার :
রাজশাহীর তানোরে এক স্কুলছাত্রীকে শ্লীলতাহানির চেষ্টার অভিযোগকে কেন্দ্র করে এক দরিদ্র কৃষক পরিবারকে জিম্মি করে সালিশের নামে ২ লাখ ৯০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, সালিশ বৈঠকে ৩ লাখ ১০ হাজার টাকা জরিমানা নির্ধারণ করা হলেও পরে ২০ হাজার টাকা কমিয়ে ২ লাখ ৯০ হাজার টাকা আদায় করা হয়। একই সঙ্গে সালিশের নামে আদায়কৃত অর্থের একটি অংশ ‘বোর্ড খরচ’ হিসেবে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার প্রকাশনগর গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা দিনমজুর মনিরুল ইসলাম মনির (৫৫) একই গ্রামের এক স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের চেষ্টা করেছেন—এমন অভিযোগ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। তবে অভিযোগটির সত্যতা যাচাই বা আইনগত তদন্তের আগেই স্থানীয় সাবেক কাউন্সিলর আবুল বাসারের নেতৃত্বে গুচ্ছগ্রামের ফুটবল মাঠে সালিশ বৈঠক বসানো হয়।
অভিযোগ রয়েছে, সালিশ বৈঠকে আবুল বাসার, বেলাল উদ্দিন, রাশেল ও রোকনসহ কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন। সেখানে মনিরুল ইসলামের পরিবারের সদস্যদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা করা হয় এবং তিন লাখ ১০ হাজার টাকা জরিমানা ধার্য করা হয়। পরিবারের কাছে নগদ টাকা না থাকায় ফাঁকা চেক ও স্ট্যাম্পে মনিরুলের স্বাক্ষর নেওয়া হয় এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টাকা পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়। টাকা দিতে ব্যর্থ হলে বাড়ির গরু-মহিষ বিক্রি করে টাকা আদায়ের হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।
পরবর্তীতে ২৩ আগস্ট আবুল বাসার ২০ হাজার টাকা কমিয়ে ২ লাখ ৯০ হাজার টাকা আদায় করেন বলে জানা গেছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, আদায়কৃত অর্থের একটি অংশ সালিশের ‘বোর্ড খরচ’ বাবদ নেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে এলাকায় নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে। যদিও এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সালিশ বৈঠকের সভাপতি আবুল বাসার।
মনিরুল ইসলামের ছেলে নাজমুল বলেন, “আমরা দরিদ্র ও অসহায়। আমাদের পরিবারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে সালিশের নামে জরিমানা আদায় করা হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা বের করা প্রয়োজন।”
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করেই সালিশ বসিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায় করা হয়েছে। এ ঘটনায় তারা প্রশাসনের হস্তক্ষেপ ও তদন্ত দাবি করেন।
অভিযোগের বিষয়ে সালিশ বৈঠকের সভাপতি ও সাবেক কাউন্সিলর আবুল বাসার বলেন, “পুরো গ্রামবাসী মিলে বিচার করেছে। সালিশে তিন লাখ ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছিল। পরে ২০ হাজার টাকা মাফ করে ২ লাখ ৯০ হাজার টাকা আদায় করা হয়েছে। ওই টাকা ভুক্তভোগীকে দেওয়া হয়েছে। আমরা কোনো টাকা নিইনি।”
সালিশের নামে বোর্ড খরচ বাবদ টাকা নেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমরা কোনো টাকা নেইনি, সম্পূর্ণ টাকা ভুক্তভোগীকে দেওয়া হয়েছে।”
ধর্ষণ বা ধর্ষণের চেষ্টা আইনগতভাবে আপসযোগ্য নয়—এমন প্রশ্নের জবাবে আবুল বাসার বলেন, “বাদী থানায় অভিযোগ করবে না। সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই বিচার করা হয়েছে। সবকিছু যদি থানা-পুলিশ করে, তাহলে কাউন্সিলর হিসেবে আমাদের কাজ কী?”
এ বিষয়ে তানোর-গোদাগাড়ী সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) আব্দুস সালাম বলেন, “এ ধরনের ঘটনা গ্রাম্য সালিশে নিষ্পত্তি করার বিষয় নয়। বাদী অভিযোগ করলে অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তানোর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বলেন, “বিষয়টি সম্পর্কে আমি কিছু জানি না। তবে এ ধরনের অভিযোগ গ্রাম্য সালিশে নিষ্পত্তি করার সুযোগ নেই। বাদী অভিযোগ করলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
স্থানীয়দের দাবি, ঘটনাটির প্রকৃত সত্য উদঘাটনে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরপেক্ষ তদন্ত করা হোক এবং অভিযোগ সত্য হলে সালিশের নামে অর্থ আদায়ের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
সম্পাদক ও প্রকাশক মমিনুল ইসলাম মুন।
মোবাইল ০১৭৪০৯৩৫৮৭০