তানোরে গাছ কাটার ঘটনায় কথিত সাংবাদিকের স্ট্যাটাস ঘিরে প্রশ্ন |;
শুকনো ডাল কাটাকে ‘সরকারি গাছ লোপাট’ বলে প্রচার, অনুসন্ধানে মেলেনি ইউএনও নাইমা খানের সংশ্লিষ্টতার তথ্য
[caption id="attachment_4429" align="aligncenter" width="172"]
এই সেই মরা ডাল যেটিকে নিয়ে এত কিছু।[/caption]
মমিনুল ইসলাম মুন নিজস্ব প্রতিনিধি রাজশাহী :
রাজশাহীর তানোরে সড়কের পাশে ঝড়ে ভেঙে পড়া একটি গাছের মরা ও চিকন ডাল কাটার ঘটনাকে ‘সরকারি গাছ লোপাট’ হিসেবে উপস্থাপন করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাইমা খানের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলার ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একজন কথিত সাংবাদিকের দেওয়া স্ট্যাটাসে ইউএনওর নির্দেশে সরকারি গাছ কাটার অভিযোগের ইঙ্গিত দেওয়া হলেও ঘটনাস্থল, স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে করা অনুসন্ধানে এর সঙ্গে ইউএনও নাইমা খানের সম্পৃক্ততার কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি।
[video poster="https://deshbartabd24.com/wp-content/uploads/2026/09/রাজশাহীর-তানোর-উপজেলা-নির্বাহী-কর্মকর্তার-ছুটির-দিনের-নির-mp4-image.jpg" width="476" height="846" mp4="https://deshbartabd24.com/wp-content/uploads/2026/09/রাজশাহীর-তানোর-উপজেলা-নির্বাহী-কর্মকর্তার-ছুটির-দিনের-নির.mp4"][/video]
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া ওই স্ট্যাটাসের শিরোনাম ছিল— “রাজশাহীর তানোর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার ছুটির দিনের নির্দেশ—তানোরে সড়কের গাছ কেটে সাবাড়—সরকারি দায়িত্ব পালনকালে সব লোপাটের অভিযোগ আসছে”।
অভিযোগের এমন উপস্থাপনা নিয়েই এখন প্রশ্ন—একটি মরা ও সরু ডাল কাটার ঘটনাকে কীভাবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নির্দেশে সরকারি গাছ ‘কেটে সাবাড়’ করার ঘটনায় পরিণত করা হলো?
ঘটনাস্থলে যা পাওয়া গেছে
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সড়কের পাশে ঝড়ে একটি গাছের ডাল ভেঙে পড়ে। পরে স্থানীয় এক ব্যক্তি ওই মরা ও চিকন ডালটি কাটছিলেন। ঘটনাস্থলে নির্বিচারে সরকারি গাছ কাটার মতো কোনো কার্যক্রম ছিল না বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
ওই সময় ঘটনাটি ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন কথিত ওই সাংবাদিক। কিন্তু ভিডিওতে দেখা দৃশ্যের সঙ্গে পোস্টের বক্তব্যের মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি।
মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধানে যে তথ্য পাওয়া গেছে, তাতে উপজেলা প্রশাসনের নির্দেশে সরকারি গাছ কাটার দাবির সঙ্গে ঘটনার বাস্তব চিত্রের মিল পাওয়া যায়নি।
ইউএনও নাইমা খানকে জড়ানোর ভিত্তি কী?
তানোর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাইমা খানের বিরুদ্ধে গাছ কাটার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ করা হলেও এর পক্ষে কোনো লিখিত সরকারি নির্দেশ, অফিস আদেশ, নথি কিংবা প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় পর্যায়ে প্রকাশ্য ও গোপন—দুইভাবেই তথ্য যাচাই করে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। অনুসন্ধানে ওই ডাল কাটার ঘটনায় ইউএনও নাইমা খান জড়িত ছিলেন—এমন নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
অর্থাৎ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের স্ট্যাটাসে যে গুরুতর অভিযোগ তুলে একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে সরাসরি প্রশ্নের মুখে দাঁড় করানো হয়েছে, তার পক্ষে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ কোথায়—এ প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।
মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচারের অভিযোগ
স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, প্রকৃত ঘটনা যাচাই না করেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইউএনও নাইমা খানকে জড়িয়ে এমন তথ্য প্রচার করা হয়েছে, যা ঘটনাস্থলের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাদের ভাষ্য, এতে একজন সরকারি কর্মকর্তার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
তদবিরের বিষয়টিও আলোচনায়
স্থানীয় পর্যায়ে আরও অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট কথিত সাংবাদিক কোনো একটি বিষয়ে প্রশাসনের কাছে তদবির নিয়ে গিয়েছিলেন। সেই তদবির কাঙ্ক্ষিতভাবে সম্পন্ন না হওয়ার পর উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ তোলা শুরু হয় বলে স্থানীয়দের কেউ কেউ দাবি করেছেন।
ইউএনও নাইমা খানের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট দুর্নীতির তথ্য কোথায়?
তানোর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাইমা খানকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন অভিযোগ তোলা হলেও তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট দুর্নীতির নথি, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, অনিয়মের লিখিত প্রমাণ কিংবা নির্দিষ্ট কোনো তদন্ত প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়নি বলে স্থানীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
অন্যদিকে, উপজেলা প্রশাসনের নিয়মিত কর্মকাণ্ড সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকারি সেবাদান ও প্রশাসনিক কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
কোনো সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ থাকলে তা অবশ্যই তদন্তযোগ্য। তবে অভিযোগকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে নথি, প্রত্যক্ষ প্রমাণ, সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য এবং নির্ভরযোগ্য তথ্য থাকা প্রয়োজন।
‘ইউএনওর কাজে সন্তুষ্ট’ স্থানীয়রা
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইউএনও নাইমা খান দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন প্রয়োজনে তারা উপজেলা প্রশাসনের সেবা পেয়েছেন। তাদের ভাষ্য, প্রশাসনিক কাজে নিয়ম-শৃঙ্খলা বজায় রাখার চেষ্টা করছেন ইউএনও।
এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “আমরা সাধারণ মানুষ। প্রয়োজন নিয়ে উপজেলা প্রশাসনে গেলে সেবা পেয়েছি। কোনো অনিয়ম আমাদের চোখে পড়েনি। কারও ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার হলে সেটি মেনে নেওয়া যায় না।”
আরেক বাসিন্দার ভাষ্য, “অভিযোগ থাকলে প্রমাণসহ বলা উচিত। একটি মরা ডাল কাটার ঘটনাকে বড় করে দেখিয়ে ইউএনওকে জড়ানো ঠিক হয়নি।
সাংবাদিকতার নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগের প্রবণতা
স্থানীয় মূলধারার সাংবাদিকদের কয়েকজন বলেন, সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে কোনো ব্যক্তি যদি তথ্য যাচাই না করে সরকারি কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ প্রচার করেন, তাহলে এর নেতিবাচক প্রভাব পুরো সাংবাদিক সমাজের ওপর পড়ে,
তাদের মতে, হাতে বুম, ক্যামেরা কিংবা একটি পরিচয়পত্র থাকাই সাংবাদিকতার চূড়ান্ত পরিচয় নয়। সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্য যাচাই, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নেওয়া এবং অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ সংগ্রহ করা জরুরি।
বিশেষ করে কোনো সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশ করলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য নেওয়া সাংবাদিকতার মৌলিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
অভিযোগ থাকলে প্রমাণসহ সামনে আসার আহ্বান্,
সচেতন নাগরিকদের দাবি, কথিত সাংবাদিকের প্রকাশিত স্ট্যাটাসে যেসব গুরুতর অভিযোগ করা হয়েছে, তার পক্ষে যদি কোনো নথি, ভিডিও, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য বা সরকারি আদেশ থাকে, তা প্রকাশ্যে উপস্থাপন করা হোক।
অন্যদিকে, অভিযোগের কোনো ভিত্তি না থাকলে একজন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করা হয়েছে কি না, সেটিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তাদের মতে, ইউএনও নাইমা খানসহ কোনো সরকারি কর্মকর্তাই জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে নন। একইভাবে সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহারকারী ব্যক্তিও তথ্য-প্রমাণের ঊর্ধ্বে নন।
তানোরের এই ঘটনা তাই শুধু একটি মরা ডাল কাটার ঘটনা নয়; এটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য যাচাই ছাড়া গুরুতর অভিযোগ প্রচার, একজন সরকারি কর্মকর্তার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা এবং সাংবাদিকতার পেশাগত দায়িত্ব ও জবাবদিহি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে।
স্থানীয়দের দাবি, বিষয়টি প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্ত করে দেখা হোক। একই সঙ্গে, তদন্তে যদি মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচারের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক।#
সম্পাদক ও প্রকাশক মমিনুল ইসলাম মুন।
মোবাইল ০১৭৪০৯৩৫৮৭০