তানোরে উন্নয়ন সহায়তা তহবিলের কোটেশন কাজে চেয়ারম্যানদের প্রভাবের অভিযোগ, তদন্তের দাবি
বিশেষ প্রতিনিধি :
রাজশাহীর তানোর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদে উন্নয়ন সহায়তা তহবিলের (ডেভেলপমেন্ট অ্যাসিস্ট্যান্স ফান্ড) প্রকল্প বাস্তবায়নে কোটেশন প্রক্রিয়া নিয়ে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, কয়েকটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যানরা নিজেদের পছন্দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করে কাগজে-কলমে কোটেশন দেখিয়ে নিম্নমানের কাজ বাস্তবায়ন করছেন। এতে সরকারি অর্থের অপচয় ও আত্মসাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও এলাকাবাসীর একাংশ।
একাধিক সূত্র জানায়, গত অর্থবছরে উপজেলার সাতটি ইউনিয়নে দুই দফায় উন্নয়ন সহায়তা তহবিলের বরাদ্দ দেওয়া হয়। বিধি অনুযায়ী এসব প্রকল্প কোটেশন বা টেন্ডারের মাধ্যমে বাস্তবায়নের কথা থাকলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় ইউপি সদস্যদের অভিযোগ, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চেয়ারম্যান ও সংশ্লিষ্টরা নিজেরাই ঠিকাদার নির্বাচন করেন এবং পরিষদের অন্য সদস্যদের প্রকল্পের বিস্তারিত তথ্য জানানো হয় না।
অভিযোগ রয়েছে, অনেক প্রকল্পে কাগজে বরাদ্দের পরিমাণ বেশি দেখানো হলেও বাস্তবে কম খরচে নিম্নমানের নির্মাণকাজ করা হয়েছে। কোথাও কোথাও একই ধরনের প্রকল্প একাধিকবার দেখিয়ে বরাদ্দ নেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে। এছাড়া প্রকল্প শুরুর আগে তথ্যসংবলিত সাইনবোর্ড টানানোর বিধান থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তা মানা হয়নি বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

স্থানীয় সরকার বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী, উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রকল্পের নাম, বরাদ্দ, বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য তথ্য সম্বলিত সাইনবোর্ড প্রদর্শনের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদারকির কথা থাকলেও বাস্তবে তদারকি কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের মধ্যে কলমা, কামারগাঁ, বাঁধাইড় ও পাঁচন্দর ইউনিয়নে বরাদ্দের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি বলে জানা গেছে। স্থানীয় ইউপি সদস্যদের অভিযোগ, এসব ইউনিয়নের অধিকাংশ প্রকল্পে চেয়ারম্যানের একক প্রভাবেই কাজ বাস্তবায়িত হয়েছে।
তালন্দ ইউনিয়নের এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, পরিষদের সদস্যদের মতামত উপেক্ষা করে অধিকাংশ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। তার দাবি, উন্নয়ন সহায়তা তহবিলের প্রকল্পে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে।
সরেজমিনে তালন্দ ইউনিয়নের কালনা আদিবাসী পাড়ায় জেঠা টুডুর বাড়ির সামনে একটি প্রটেকশন ওয়াল নির্মাণ প্রকল্প দেখা যায়। প্রকল্পের সাইনবোর্ড অনুযায়ী, জেঠার বাড়ি থেকে নরেশের বাড়ি পর্যন্ত প্রটেকশন ওয়াল নির্মাণ" শীর্ষক প্রকল্পে বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৬১ হাজার টাকা। স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্মাণকাজে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে এবং প্রকল্পের প্রকৃত ব্যয় বরাদ্দের তুলনায় অনেক কম। তাদের দাবি, প্রকল্পটির স্বাধীন কারিগরি তদন্ত হলে অনিয়মের বিষয়টি স্পষ্ট হবে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তালন্দ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নাজিমুদ্দিন বাবু। তিনি বলেন, প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার পর ছবি ও প্রয়োজনীয় তথ্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠাতে হয়। নিয়মের বাইরে কাজ করার সুযোগ নেই।
কাজ বাস্তবায়ন যদি চেয়ারম্যানের তত্ত্বাবধানে হয়ে থাকে, তাহলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করা হয়েছে কেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এভাবেই কাজ হয়ে থাকে।
এ বিষয়ে উপজেলা প্রকৌশলী নুর নাহার বলেন, এসব প্রকল্প আমাদের দপ্তরের আওতায় নয়। বরাদ্দ ও বাস্তবায়নের বিষয়টি নির্বাহী দপ্তর দেখে।
তানোর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাঈমা খান বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবহিত নই। অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হবে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, উন্নয়ন সহায়তা তহবিলের আওতায় বাস্তবায়িত সব প্রকল্পের কারিগরি ও আর্থিক নিরীক্ষা করা হলে প্রকৃত চিত্র উঠে আসবে এবং অনিয়ম থাকলে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক মমিনুল ইসলাম মুন।
মোবাইল ০১৭৪০৯৩৫৮৭০