এডিআর নিয়ে নতুন ভাবনা: মামলা জট কমাতে গিয়ে বিচারপ্রার্থীদের হয়রানি বাড়বে না তো?||
অ্যাডভোকেট মায়া আক্তারের বিশ্লেষণ—এডিআর হোক ভুক্তভোগীবান্ধব, চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার নয়
মমিনুল ইসলাম মুন নিজস্ব প্রতিবেদক রাজশাহী :
মামলা জট কমানো ও দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বা এডিআর (Alternative Dispute Resolution) পদ্ধতিকে উৎসাহিত করার উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন আইনজীবী ও সংশ্লিষ্টরা। তবে কোন ধরনের বিরোধ এডিআরের আওতায় আসবে এবং কোন ক্ষেত্রে সরাসরি বিচারিক প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে—এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা ও ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন অ্যাডভোকেট মায়া আক্তার।
এডিআরের সম্ভাবনা ও বাস্তব প্রয়োগের বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করে অ্যাডভোকেট মায়া আক্তার মনে করেন, মামলা জট কমানোর মহৎ উদ্দেশ্য যেন কোনোভাবেই বিচারপ্রার্থীর ন্যায়বিচারের অধিকারকে দুর্বল না করে। বিশেষ করে দণ্ডবিধির ৩২৫, ৩৫৪, ৩৭৯, ৩৮০ ও ৩৮১ ধারার মতো অপরাধের ক্ষেত্রে এডিআর প্রয়োগের আগে বাস্তব পরিস্থিতি, অপরাধের ধরন, ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা এবং স্বাধীন সম্মতির বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
গুরুতর আঘাতের ঘটনায় আপস কতটা ন্যায়সংগত—প্রশ্ন অ্যাডভোকেট মায়া আক্তারের
দণ্ডবিধির ৩২৫ ধারায় স্বেচ্ছায় গুরুতর আঘাত করার অপরাধের শাস্তির বিধান রয়েছে। এ ধরনের ঘটনায় হাড় ভেঙে যাওয়া, গুরুতর জখম কিংবা স্থায়ী শারীরিক ক্ষতির মতো ঘটনা ঘটতে পারে।
অ্যাডভোকেট মায়া আক্তারের বিশ্লেষণে প্রশ্ন উঠেছে—গুরুতরভাবে আহত একজন ব্যক্তি ন্যায়বিচারের আশায় আইনের দ্বারস্থ হওয়ার পর তাকে যদি অভিযুক্ত ব্যক্তির সঙ্গে আপস-মীমাংতায় বসানো হয়, তাহলে তার মানসিক অবস্থা ও স্বাধীন সিদ্ধান্তের বিষয়টি কীভাবে নিশ্চিত করা হবে?
ভুক্তভোগী যেন ভয়, হুমকি, সামাজিক চাপ কিংবা প্রভাবশালী মহলের চাপে আপস করতে বাধ্য না হন, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
নারী নির্যাতনের ঘটনায় নতুন করে চাপের আশঙ্কা
দণ্ডবিধির ৩৫৪ ধারায় নারীর শালীনতা বা মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে আক্রমণ বা অপরাধমূলক বলপ্রয়োগের মতো কর্মকাণ্ডকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
এ ধরনের ঘটনায় একজন নারীকে সামাজিক ও মানসিকভাবে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। সামাজিক লজ্জা, পারিবারিক চাপ কিংবা চরিত্র নিয়ে প্রশ্নের কারণে অনেক নারী আইনগত প্রতিকার চাইতেও সংকোচবোধ করেন।
অ্যাডভোকেট মায়া আক্তারের মতে, এমন পরিস্থিতিতে কোনো নারী সাহস করে আইনের আশ্রয় নেওয়ার পর তাকে অভিযুক্ত ব্যক্তির মুখোমুখি বসিয়ে আপসের জন্য চাপ দেওয়া হলে তা তার জন্য নতুন করে মানসিক আঘাতের কারণ হতে পারে।
তাই নারী নির্যাতন বা নারীর শালীনতা হরণের মতো অভিযোগের ক্ষেত্রে এডিআর প্রয়োগের আগে ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা, স্বাধীন সম্মতি এবং মানসিক অবস্থাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
চুরি হয়েছে, কিন্তু চোর শনাক্ত হয়নি—এডিআর হবে কার সঙ্গে?
দণ্ডবিধির ৩৭৯ ধারায় চুরির অপরাধের শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে অনেক চুরির ঘটনায় অপরাধীকে তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত বা গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয় না।
অ্যাডভোকেট মায়া আক্তার এই জায়গাতেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তব প্রশ্ন সামনে এনেছেন—চুরি যাওয়া সম্পত্তির মালিক মামলা করেছেন, কিন্তু চোরই শনাক্ত হয়নি; তাহলে এডিআরের মাধ্যমে আপস হবে কার সঙ্গে?
অপরাধী শনাক্ত না হলে আপস-মীমাংতার বাস্তব সুযোগ কোথায়—এ প্রশ্নের পাশাপাশি চুরি যাওয়া মালামাল উদ্ধার, অপরাধী শনাক্তকরণ এবং তদন্তের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বসতঘরে চুরির ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন
দণ্ডবিধির ৩৮০ ধারায় বসতঘর, তাঁবু বা জলযানে চুরির অপরাধের শাস্তির বিধান রয়েছে। বিশেষ করে পরিবারের সদস্যরা ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় চুরি হলে অনেক সময় ভুক্তভোগীরা জানতেই পারেন না কারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে অভিযুক্ত ব্যক্তি শনাক্ত হওয়ার আগেই যদি বিষয়টি আপস-মীমাংতার দিকে নেওয়া হয়, তাহলে ভুক্তভোগী কার সঙ্গে আপস করবেন—এই প্রশ্ন থেকেই যায়।
একই ধরনের প্রশ্ন উঠতে পারে দণ্ডবিধির ৩৮১ ধারার ক্ষেত্রেও, যেখানে মালিক বা নিয়োগকর্তার দখলে থাকা সম্পত্তি কর্মচারী কর্তৃক চুরির বিষয়টি শাস্তিযোগ্য করা হয়েছে।
সব বিরোধের ক্ষেত্রে একই পদ্ধতিতে এডিআর নয়
এডিআরের কার্যকারিতা নিয়ে ইতিবাচক দিকও তুলে ধরেছেন অ্যাডভোকেট মায়া আক্তার।
তার মতে, আর্থিক লেনদেন, পাওনা টাকা আদায় কিংবা পারিবারিক অনেক বিরোধ পারস্পরিক সম্মতি ও আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা সম্ভব। এতে দীর্ঘদিনের মামলা পরিচালনার সময়, অর্থ ও ভোগান্তি কমতে পারে।
তবে সব ধরনের অপরাধকে একই দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ নেই। ‘আপসযোগ্য বিরোধ’ এবং ‘গুরুতর অপরাধ’-এর মধ্যে সুস্পষ্ট সীমারেখা থাকা প্রয়োজন—এমন মত তার বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
স্থানীয় প্রভাবশালীদের চাপের ঝুঁকি
এডিআরের বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের হস্তক্ষেপ নিয়েও সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন অ্যাডভোকেট মায়া আক্তার।
কোনো বিরোধে দুই পক্ষকে স্থানীয়ভাবে বসিয়ে মীমাংসার চেষ্টা করা হলে সেখানে রাজনৈতিক, সামাজিক কিংবা অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা কোনো পক্ষকে চাপ দিচ্ছেন কি না, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
বিশেষ করে নারী, শিশু কিংবা আর্থিকভাবে দুর্বল কোনো পক্ষ যেন সামাজিক বা পারিবারিক চাপে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য না হন, সে বিষয়ে বিশেষ সুরক্ষা প্রয়োজন।
এডিআরের আগে নিরাপত্তা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিতের আহ্বান
অ্যাডভোকেট মায়া আক্তার মনে করেন, এডিআর কার্যক্রম সম্প্রসারণের পাশাপাশি ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা, স্বাধীন সম্মতি, নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী এবং প্রভাবমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
[caption id="attachment_2703" align="aligncenter" width="198"]
দেশবার্তা bd24.com নিউজ পোর্টালে সাংবাদিক নিয়োগ চলছে,,, আজ ই যোগাযোগ করুন [/caption]
কারণ কোনো কোনো বিরোধে দুই পক্ষকে আলোচনায় বসানোর আগেই উত্তেজনা বা সংঘর্ষের ঘটনা ঘটতে পারে। ফলে প্রতিটি মামলার প্রকৃতি যাচাই না করে সব বিরোধকে একই প্রক্রিয়ায় মধ্যস্থতায় নিয়ে আসা বাস্তবসম্মত নাও হতে পারে।
মামলা জট কমুক, তবে ন্যায়বিচারের মূল্য দিয়ে নয়
বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় মামলা জট ও দীর্ঘসূত্রতা কমানো নিঃসন্দেহে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ কারণে এডিআর একটি কার্যকর ও সময়োপযোগী ব্যবস্থা হতে পারে।
তবে অ্যাডভোকেট মায়া আক্তারের বিশ্লেষণের মূল প্রশ্ন হলো—মামলা জট কমানোর উদ্যোগ যেন কোনোভাবেই ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচারের অধিকারকে দুর্বল না করে।
কোন অপরাধ এডিআরের মাধ্যমে নিষ্পত্তিযোগ্য, কোন অপরাধে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে এবং কোন ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর সম্মতিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত ও বাস্তবসম্মত নির্দেশনা প্রয়োজন।
অন্যথায় মামলা জট কমানোর উদ্দেশ্যে যদি ভুক্তভোগীকে বারবার আপসের টেবিলে বসতে হয়, অপরাধী সহজে দায়মুক্তির সুযোগ পায় কিংবা স্থানীয় প্রভাবশালীদের চাপ তৈরি হয়, তাহলে এডিআর সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে নতুন সমস্যার জন্ম দিতে পারে।
সাংবাদি
অ্যাডভোকেট মায়া আক্তারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এডিআর বাতিল নয়—প্রয়োজন এর সঠিক, নিরাপদ ও ভুক্তভোগীবান্ধব প্রয়োগ। অপরাধের ধরন, ভুক্তভোগীর অধিকার এবং দেশের বাস্তব সামাজিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সুস্পষ্ট কাঠামো তৈরি করা গেলে এডিআর একদিকে যেমন মামলা জট কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে, অন্যদিকে তেমনি বিচারপ্রার্থীদের অধিকারও সুরক্ষিত থাকবে।
তাই মূল প্রশ্ন থেকেই যায়—মামলা জট কমাতে গিয়ে বিচারপ্রার্থীদের হয়রানি বাড়বে না তো?
সম্পাদক ও প্রকাশক মমিনুল ইসলাম মুন।
মোবাইল ০১৭৪০৯৩৫৮৭০